‘আমাগো বাড়ি দিয়া স্কুলে আইতে পাঁচটা খাল সাঁতরে আসতে হয়। প্রতিদিনই আমিসহ ৭-৮ জন খালে সাঁতার কেটে স্কুলে আসি। বেশি বৃষ্টি থাকলে বই-খাতা ভিজে যায়। বই-খাতা ভিজে গেলে কয়েক দিন আবার স্কুলে আসতে পারি না। আমাগো স্কুলে যাওয়ার কোনো রাস্তা নাই।’
কথাগুলো চরকারফারমার শেষ সীমানার দক্ষিণ পাশে ফরেস্টের কাছ থেকে আসা চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. জহিরুল ইসলামের।
একই বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইয়াসিন বলে, ‘আমাগো একটা নৌকা আছে। কিন্তু ওই নৌকা দিয়া বাবা নদীতে মাছ ধরতে যায়। তাই খাল সাঁতরেই স্কুলে যেতে হয়। বৃষ্টি ও খালের পানিতে ভিজে স্কুলে আসায় শরীর সারাদিন ভিজা ভিজা থাকে। এতে কিছুদিন পরপর শরীর খারাপ করে। স্কুলে আসার ইচ্ছে থাকলেও অসুস্থতার কারণে বেশির ভাগ সময় বাড়িতেই থাকতে হয়।’
শীত, বর্ষা কিংবা বসন্ত বারো মাসই খাল সাঁতরে স্কুলে যেতে হয় পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার সদর ইউনিয়নের দুর্গম চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। বিদ্যালয়ে যাতায়াতের জন্য নেই কোনো সড়ক। প্রায় অর্ধশতাধিক শিশুর জন্য নেই নৌযান বা বিকল্প কোনো ব্যবস্থাও। ফলে খাল সাঁতরে ভিজে স্কুলে আসতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে স্কুলবিমুখতা।
সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের একটি অংশ চরকারফারমা। আগুনমুখার মোহনায় বিভক্ত সদর ইউনিয়নের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে গড়ে উঠেছে দ্বীপটি। এর দক্ষিণে ম্যানগ্রোভ বন, তার পরেই বঙ্গোপসাগর। পশ্চিমে রামনাবাদ নদী, পূর্বে তেঁতুলিয়া নদী এবং উত্তরে উত্তাল আগুনমুখার মোহনা। দূর থেকে দ্বীপটি দর্শনীয় হলেও রাস্তাঘাট না থাকায় বসবাসরত সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে এ ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।
দ্বীপটিতে কোনো বেড়িবাঁধ না থাকায় বছরের বিভিন্ন সময়ে জোয়ারের পানিতে স্কুল মাঠসহ রাস্তাঘাট ডুবে থাকে। এতে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়।
চরটিতে ৮০টি জেলে ও কৃষক পরিবার বসবাস করে। এসব পরিবারের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৫১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে ২৬ জন ছাত্র ও ২৫ জন ছাত্রী। তাদের পাঠদানে রয়েছেন তিনজন শিক্ষক।
দুর্গম চরকারফারমায় যেতে হলে গলাচিপা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে সদর ইউনিয়নের বোয়ালিয়া ¯øুইসগেটে যেতে হয়। সেখান থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার পায়ে হেঁটে আগুনমুখার তীরে খেয়াঘাটে যেতে হয়। কারফারমা দ্বীপে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম এই খেয়া। শিক্ষকসহ সাধারণ মানুষকে অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
খেয়ায় উত্তাল আগুনমুখা নদী পার হয়ে কারফারমা ঘাটে নামার পরও শেষ হয় না দুর্ভোগ। বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে অন্তত পাঁচটি খাল সাঁতরে যেতে হয় শিক্ষার্থীদের। একদিকে যোগাযোগের জন্য কোনো রাস্তা নেই, অন্যদিকে দ্বীপটির ভেতরে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা খালগুলো স্বাভাবিক চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। প্রতিনিয়ত এসব প্রতিকূলতার মধ্যেই বিদ্যালয়ে যাতায়াত করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি শাহিদা বেগম বলেন, ‘এ চরে ৮০টি পরিবার বসবাস করে। আমি জায়গা দিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠা করি। কিন্তু রাস্তা করার মতো আমার সামর্থ্য নেই। স্কুলে যাতায়াতের জন্য হলেও কিছু রাস্তাঘাট করা দরকার।’
সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর হোসেন টুটু বলেন, ‘স্কুলে যাওয়ার রাস্তা নেই এ কথাটি সত্য। আপাতত কোনো বরাদ্দ নেই। সামনে বরাদ্দ পেলে অবশ্যই রাস্তার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে।’
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. গোলাম সগীর বলেন, ‘বিষয়টি দুঃখজনক। রাস্তা না থাকার কারণে স্কুলের শিক্ষার্থী কমে গেছে। স্কুলে যাওয়ার রাস্তা না থাকার বিষয়টি ইউএনও ও প্রতিমন্ত্রী মহোদয়কে অবহিত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, ‘সামনের বরাদ্দ দিয়ে স্কুলে যাওয়ার উপযোগী একটি রাস্তা করে দেব।’

