দর-কষাকষি থেকে আইনি প্রক্রিয়া

শত শত কোটি ইউরোতে হয় ফুটবলের দলবদল, দুই ক্লাবের মধ্যে চলে সমঝোতা

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫২

ফুটবলে দলবদল মানেই শুধু একজন খেলোয়াড়ের এক ক্লাব ছেড়ে অন্য ক্লাবে যাওয়া নয়। এর পেছনে থাকে দীর্ঘ স্কাউটিং, ক্লাবের মধ্যে দর-কষাকষি, খেলোয়াড়ের চুক্তি, এজেন্টের ভূমিকা, মেডিক্যাল পরীক্ষা থেকে শুরু করে নানা আইনি ও আর্থিক প্রক্রিয়া। শত শত কোটি ইউরোর এই লেনদেন কীভাবে চূড়ান্ত হয়, তা নিয়ে রয়েছে বেশ কিছু নিয়ম ও হিসাব।

সহজ ভাষায়, ফুটবল ট্রান্সফার হলো দুটি ক্লাবের মধ্যে একটি ব্যবসায়িক চুক্তি। কোনো খেলোয়াড় বর্তমান ক্লাবের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকলে তাকে দলে নিতে আগ্রহী ক্লাবকে সাধারণত বর্তমান ক্লাবকে ট্রান্সফার ফি দিতে হয়। যেমন, সম্প্রতি ফরাসি ক্লাব লিল থেকে মরক্কোর মিডফিল্ডার আইয়ুব বুয়াদ্দিকে দলে নিতে ম্যানচেস্টার সিটি ৯ কোটি ৫০ লাখ ইউরো খরচ করেছে।

তবে এই অর্থের পরিমাণ কোনো নির্দিষ্ট নিয়মে আগে থেকেই ঠিক করা থাকে না। খেলোয়াড়ের বর্তমান পারফরম্যান্স, বয়স, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, বাণিজ্যিক মূল্য এবং বর্তমান চুক্তির মেয়াদ—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে দুই ক্লাবের আলোচনার মাধ্যমে ট্রান্সফার ফি নির্ধারিত হয়। খেলোয়াড়ের চুক্তির মেয়াদ যত কম থাকে, অনেক ক্ষেত্রে তার জন্য বড় অঙ্কের ট্রান্সফার ফি পাওয়ার সুযোগও তত কমে আসে।

একজন খেলোয়াড়কে দলে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় সাধারণত দীর্ঘদিনের স্কাউটিং থেকে। সম্ভাব্য খেলোয়াড়কে পর্যবেক্ষণের পর আগ্রহী ক্লাব তার বর্তমান ক্লাবের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠায়। বিক্রয়কারী ক্লাব প্রস্তাবে সম্মতি দিলে দুই পক্ষ ট্রান্সফার ফি ও অন্যান্য শর্ত নিয়ে আলোচনা করে। এরপর খেলোয়াড়ের এজেন্টের সঙ্গে নতুন চুক্তির বিষয়ে দর-কষাকষি শুরু হয়।

এই পর্যায়ে খেলোয়াড়ের সাপ্তাহিক বেতন, চুক্তির মেয়াদ, সাইনিং-অন বোনাস, পারফরম্যান্স বোনাসসহ বিভিন্ন বিষয় নির্ধারণ করা হয়। ফলে একটি ট্রান্সফারের ঘোষিত অঙ্ক দেখেই পুরো চুক্তির আর্থিক মূল্য বোঝা যায় না।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে খেলোয়াড়ের এজেন্টের। জর্জ মেন্দেস কিংবা প্রয়াত মিনো রাইওলার মতো প্রভাবশালী এজেন্টরা শুধু খেলোয়াড়ের বেতন নিয়ে আলোচনা করেন না; ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি, ট্রান্সফার, বোনাসসহ ক্যারিয়ারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও তারা বড় ভূমিকা রাখেন।

তবে ক্লাবের আনুষ্ঠানিক অনুমতি ছাড়া কোনো খেলোয়াড়কে গোপনে দলবদলে রাজি করানোর চেষ্টা করলে সেটিকে ‘ট্যাপিং আপ’ বলা হয়। নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের যোগাযোগ নিষিদ্ধ। কিন্তু গোপনে হওয়ায় তা প্রমাণ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

কিছু ক্ষেত্রে আবার কোনো ট্রান্সফার ফিই দিতে হয় না। খেলোয়াড়ের সঙ্গে বর্তমান ক্লাবের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তিনি ফ্রি ট্রান্সফারে অন্য ক্লাবে যোগ দিতে পারেন। ১৯৯৫ সালের ঐতিহাসিক বোসম্যান রুলিংয়ের পর চুক্তির শেষ ছয় মাসে খেলোয়াড়েরা অন্য ক্লাবের সঙ্গে আগাম আলোচনা বা প্রি-কনট্রাক্ট করতে পারেন।

আবার কোনো খেলোয়াড়ের চুক্তিতে যদি রিলিজ ক্লজ বা বাইআউট ক্লজ থাকে, তাহলে দলবদলের প্রক্রিয়া আরও সরাসরি হতে পারে। চুক্তিতে আগে থেকেই নির্ধারিত ওই অঙ্ক কোনো আগ্রহী ক্লাব পরিশোধ করতে রাজি হলে বিক্রয়কারী ক্লাবের আর ট্রান্সফার ফি নিয়ে দর-কষাকষির সুযোগ থাকে না। তবে এতে খেলোয়াড়ের সম্মতি নিশ্চিত হয় না। নতুন ক্লাবের সঙ্গে তার বেতন, চুক্তির মেয়াদ ও অন্যান্য ব্যক্তিগত শর্ত নিয়ে আলাদা সমঝোতা করতে হয়।

দলবদল আবার সারা বছর খোলা থাকে না। ফিফা ও সংশ্লিষ্ট দেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে ট্রান্সফার উইন্ডো খোলা হয়। সাধারণত মৌসুম শেষে গ্রীষ্মকালীন উইন্ডোতে ক্লাবগুলো বড় পরিসরে দল গুছিয়ে নেয়। আর জানুয়ারির শীতকালীন উইন্ডোতে মৌসুমের মাঝপথে প্রয়োজন অনুযায়ী খেলোয়াড় দলে ভেড়ানো হয়।

ট্রান্সফার ফিও সাধারণত একবারে পরিশোধ করা হয় না। চুক্তির মেয়াদ অনুযায়ী কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা থাকতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে ‘অ্যাড-অনস’—যেমন নির্দিষ্টসংখ্যক গোল, ম্যাচ খেলা কিংবা কোনো ট্রফি জিতলে বাড়তি অর্থ দেওয়ার শর্ত। আবার ‘সেল-অন ক্লজ’ থাকলে ভবিষ্যতে ওই খেলোয়াড়কে অন্য ক্লাবে বিক্রি করার সময় আগের ক্লাব ট্রান্সফার ফির একটি নির্দিষ্ট শতাংশ পেতে পারে।

সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো, ট্রান্সফার ফি সরাসরি খেলোয়াড়ের হাতে যায়। বাস্তবে ট্রান্সফার ফি মূলত বিক্রয়কারী ক্লাব পায়। খেলোয়াড় পান তার নতুন চুক্তিতে নির্ধারিত বেতন, সাইনিং বোনাস ও অন্যান্য সুবিধা। কিছু ক্ষেত্রে সাইনিং-অন বা লয়্যালটি বোনাস হিসেবে বড় অঙ্কের অর্থ পেলেও সেটি ট্রান্সফার ফির অংশ নয়।

এই লেনদেনে এজেন্টরাও কমিশন পান। সাধারণত খেলোয়াড়ের হয়ে কাজ করলে তারা খেলোয়াড়ের বেতনের প্রায় ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন পেতে পারেন। আর বিক্রয়কারী ক্লাবের হয়ে কাজ করলে ট্রান্সফার ফির প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন পাওয়ার নজির রয়েছে। তবে চুক্তি ও পক্ষভেদে এই হার কম-বেশি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে খেলোয়াড়ের বদলে ক্রয়কারী ক্লাবই এজেন্টের ফি পরিশোধ করে।

সব আর্থিক ও ব্যক্তিগত শর্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর আসে মেডিক্যাল পরীক্ষার ধাপ। খেলোয়াড়কে নতুন ক্লাবের মেডিক্যাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। আন্তর্জাতিক দলবদলের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ রাখতে ফিফার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রান্সফার ম্যাচিং সিস্টেম’ বা টিএমএস ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি বিদেশি খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ম অনুযায়ী ওয়ার্ক পারমিট বা কাজের অনুমতির প্রয়োজন হতে পারে।

অর্থাৎ, মাঠে একজন খেলোয়াড়ের দলবদলের খবর যতটা সহজ মনে হয়, এর পেছনের প্রক্রিয়াটি ততটাই জটিল। একটি ট্রান্সফার চূড়ান্ত হওয়ার আগে ক্লাব, খেলোয়াড়, এজেন্ট, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট ফুটবল কর্তৃপক্ষকে একাধিক ধাপ পার হতে হয়। শেষ পর্যন্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেই শত কোটি ইউরোর সেই দলবদল বাস্তবে রূপ নেয়।

সূত্র: বিবিসি

ইত্তেফাক/এসএ