এক উপজেলায় তিন মাসে ‘উধাও’ ৪০ কিশোরী

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১৮:১৯

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে কিশোর বয়সী মেয়েদের ঘর ছাড়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত তিন মাসে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ৪০ কিশোরী উধাও হয়ে গেছে। তাদের বেশিরভাগই মুঠোফোনে পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে বাড়ি ছেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার পর কারও কারও অবস্থান শনাক্ত করা গেলেও অনেকেই পরিবারের কাছে ফিরে যেতে অনীহা দেখাচ্ছে।

পুলিশ বলছে, গত বৃহস্পতিবারই (২৭ আগস্ট) উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে চার কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। তাদের বয়স ১৪ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে দুজনের অবস্থান শনাক্ত করতে পেরেছে পুলিশ। অন্য দুজনের সন্ধানেও চেষ্টা চলছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘর ছাড়ার এসব ঘটনায় স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও রয়েছে। মুঠোফোনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে অপরিচিত বা পরিচিত তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগের পর অনেক কিশোরী আবেগের বশে বাড়ি ছাড়ছে। পরে তাদের কেউ কেউ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও বাড়ি ফিরতে চাইছে না।

গত বৃহস্পতিবার আড়াইহাজার থানায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকার চার কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ আসে। তাদের বয়স ১৪ থেকে ১৭ বছর। পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান না পেয়ে থানায় জিডি করেন।

পুলিশ তদন্তের মাধ্যমে তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে পরিবারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বা তারা স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়েছে কি না; এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

কিশোরীদের ঘর ছাড়ার ঘটনায় মুঠোফোনের ব্যবহারকে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে খুব সহজেই নতুন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের অজান্তে দীর্ঘদিন ধরে কথাবার্তা চলার পর সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ পায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে আশেপাশের কিশোর কিশোরীরাও প্রেমে আসক্ত হচ্ছে। তাদের বাড়ির পাশাপাশি হওয়ায়ও প্রেমের ঘটনা ঘটছে।

এরপর পারিবারিক বাধা, অভিভাবকের শাসন কিংবা সম্পর্কটি মেনে না নেওয়ার আশঙ্কা থেকে কেউ কেউ ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য।

তবে শুধু মুঠোফোনকে দায়ী না করে এর সঙ্গে পারিবারিক যোগাযোগের ঘাটতি, কিশোর বয়সের আবেগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সচেতনতার অভাব এবং সন্তানের প্রতি পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে এক অভিভাবক জানান, কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার পর অনেক পরিবার সামাজিকভাবে বিষয়টি প্রকাশ করতে চান না। বিশেষ করে প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাবে; এই আশঙ্কায় কেউ কেউ পুলিশকে জানাতেও দেরি করেন।

স্থানীয় আরও এক অভিভাবক বলেন, মেয়ের বিষয় বলে অনেকে সামাজিক সম্মানের কথা চিন্তা করে বিষয়টি গোপন রাখেন। কিন্তু এতে সমস্যা আরও বাড়ে। দ্রুত পুলিশকে জানালে অন্তত মেয়েটির অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করা যায়।

পুলিশের অনুসন্ধানে কিশোরীর অবস্থান শনাক্ত হওয়ার পরও সব ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সহজ হয় না। পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে কেউ কেউ অনীহা প্রকাশ করে। বিশেষ করে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হলে কিশোরীর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার মতো নানা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে কিশোরীকে উদ্ধার করার পাশাপাশি তার নিরাপত্তা, মানসিক অবস্থা এবং সে কোনো ধরনের চাপ বা প্রলোভনের শিকার হয়েছে কি না; এসব বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আড়াইহাজার উপজেলা নির্বাহী অফিসের মো. আসাদুর রহমান বলেন, শুধু মোবাইল কেড়ে নেওয়া কিংবা শাসন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে কিশোরীদের সচেতন করা এবং তাদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

আড়াইহাজার থানার ওসি মো. সবজেল হোসেন বলেন, গত তিন মাসে ৪০টি নিখোঁজের ডিডি করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে অভিভাবকদের প্রতি পরামর্শ, কোনো কিশোরী নিখোঁজ হলে বিষয়টি গোপন না রেখে দ্রুত থানায় যোগাযোগ করতে হবে। একই সঙ্গে তার সাম্প্রতিক ছবি, মুঠোফোন নম্বর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য, কার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল এবং সম্ভাব্য কোথায় যেতে পারে; এসব তথ্য পুলিশকে দিলে অনুসন্ধানে সহায়তা পাওয়া যায়।

ইত্তেফাক/এপি