বন্যার পর আবার স্বপ্ন দেখছেন চট্টগ্রামের কৃষকরা

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০১৯, ১৭:০৬

গতমাসে টানা পাহাড়ি ঢল ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলায় কৃষকরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। বন্যায় আউশ, আমনের বীজতলা, সবজি ও গবাদি পশুর ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। অনেক উপজেলায় আউশের রোপা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তবে সামনের আমন মৌসুমকে সামনে রেখে বীজতলা তৈরি করে, নতুন করে গবাদি পশু সংগ্রহ করে ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম শুরু করেছেন প্রান্তিক কৃষকরা।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই মাসে টানা বন্যায় সারাদেশের ৩১ জেলায় সাড়ে ছয় লাখের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। চট্টগ্রামের উত্তরাংশে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম হলেও দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, আনোয়ারাসহ বেশ কয়েকটি উপজেলায় বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই এলাকায় ৩৬ হাজার ৫৩১ জন কৃষক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হন- যাদের আউশের মাঠ, আমনের বীজতলা ও সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ। টাকার অংকে এই ক্ষতির পরিমাণ সাড়ে ১২ কোটি টাকা।
প্রান্তিক পর্যায়ের বেশ ক’জন কৃষকের সঙ্গে আলাপের পর জানা গেছে, একদিকে বন্যায় ধান, বীজতলা সবজির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা অনেক গবাদি পশুও বন্যায় মারা গেছে। এতে করে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। তবে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর থেকে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে থাকে সবকিছু। ইতিমধ্যে অনেক এলাকায় অগ্রিম আমনের চারা রোপন শুরু হয়েছে।

চন্দনাইশের কৃষক খাইরুল হক ইত্তেফাককে জানান, বন্যায় তার প্রায় ২ বিঘা জমির আউশের রোপা নষ্ট হয়ে যায়। একই সঙ্গে ওই জমিতে আমন রোপনের জন্য যে বীজতলা তৈরি করা হয়েছিলো সেগুলোর অর্ধেকের বেশি নষ্ট হয়ে যায়। তবে বন্যার পর নতুন করে কিছু বীজতলা তৈরি করা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে কিছু চারা সংগ্রহ করার পরিকল্পনা আছে। কিছু জমিতে আগে ভাগে আমন ধান লাগাবেন। আমনের ফলন ভালো হলে আউশের ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে উঠবে। আগেভাগে আমন ঘরে আসলে সেখানে সবজি চাষ করা যাবে।

সাতকানিয়ার চলতি ইউনিয়নের কৃষক জমির উদ্দিন জানান, তিনি ঈদকে সামনে রেখে চারটি গরু মোটাতাজা করেছিলেন। পাশাপাশি নিজের কিছু জমি এবং বর্গা জমিতে আউশ চাষ করেছিলেন। কিন্তু বন্যায় আউশের রোপা নষ্ট হয়ে যায়। একটি গরুও মরে যায়। বাকি গরুগুলো কমদামে বিক্রি করে দেন। নতুন করে আউশ লাগানোর সময় ছিল না। সবমিলিয়ে বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েন। তবে কোরবানি ঈদের বাজারের শেষদিকে তিনি নতুন করে দুটি গরু কিনেছেন। সেই সঙ্গে আমনও রোপন করবেন।

সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ছাড়াও আনোয়ারা, বাঁশখালীসহ যেসব উপজেলায় বন্যায় কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বেশিরভাগ এলাকাতেই এখন আমন রোপনের ধুম চলছে। চলতি মৌসুমে চট্টগ্রাম জেলায় এক লাখ ৮২ হাজার ৬৯৪ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে কৃষি বিভাগ। জেলার অন্যান্য উপজেলার মতো ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোতেও এখন আমন আবাদ করা হচ্ছে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা এসব উপজেলায় বাড়তি খোঁজ খবর নিচ্ছেন ও পরামর্শ দিচ্ছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এমন সময়ে বন্যা হয় যখন আউশ রোপনের সময় প্রায় শেষ। কেউ কেউ নতুন করে কিছু আউশ রোপনের চেষ্টা করলেও বেশিরভাগ কৃষক আমন রোপনে জোর দিচ্ছেন। পাশাপাশি অনেকে সবজি চাষে ঝুঁকেছেন। সবজির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা শরৎ ও শীতকালীন সবজি চাষ করতে কৃষকদের অনুপ্রাণিত করছেন।

আরও পড়ুন: উলিপুরে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু

কৃষকরা বলছেন, আবহাওয়া ঠিক থাকলে আমনের রোপা ঠিকঠাক মতো লাগানো যাবে। মৌসুমের আগেভাগে যদি আমন ধান ঘরে তোলা যায় তাহলে তুলনামূলক উঁচু জমিতে সবজি চাষ করা যাবে। তাতে করে বন্যার ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। তবে এরমধ্যে আবহাওয়া যদিও অস্বাভাবিক আচরণ করে, অসময়ে অধিক বৃষ্টিপাত হয় তাহলে কৃষকরা আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

ইত্তেফাক/কেকে