ক্লাসচলাকালীন বিদ্যালয়ে বহিরাগতদের হামলা!

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৯

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হইল জ্ঞানার্জনের পবিত্র তীর্থস্থান। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্নেহের সম্পর্ক বজায় থাকা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাঝেমধ্যে শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত বা মারামারি যেমন হয়, তেমনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যেও কোনো কারণে উত্তেজনা দেখা দিতে পারে। অধিকাংশ সময় তাহা মিটমাট হইয়া যায়। বাংলাদেশে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। এমনকি এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। মাঝেমধ্যে স্থানীয় অধিবাসী বা বহিরাগতদের সঙ্গেও তাহাদের সংঘর্ষের ঘটনা দেখা যায়। কিন্তু স্কুলে ক্লাসচলাকালীন বহিরাগতরা হামলা চালাইয়া প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের ধরিয়া লইয়া যাইবে বা মারধর করিবে এমন ঘটনা সাধারণত ঘটিতে দেখা যায় না। টাঙ্গাইলের গোপালপুরে এমনই একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়াছে যাহা দুঃখ ও লজ্জাজনক।

ইত্তেফাকে প্রকাশিত খবরে বলা হইয়াছে, টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার নগদাশিমলা ইউনিয়নের সৈয়দপুর উচ্চবিদ্যালয়ে ক্লাস চলিবার সময় একদল সন্ত্রাসী কক্ষে প্রবেশ করিয়া শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্মুখেই দুই শিক্ষার্থীকে বেধড়ক মারধর করে। তাহাদের হামলায় ঐ দুই শিক্ষার্থী এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের ভাষ্যমতে, প্রেমঘটিত ঘটনা লইয়া প্রথমে অষ্টম ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে মারামারি হয়। ঐ দিনই শিক্ষকরা তাহা মীমাংসা করিয়া দেন। কিন্তু সেই ঘটনার জের ধরিয়া অষ্টম শ্রেণির ছাত্রদের পক্ষ লইয়া বহিরাগত একদল সন্ত্রাসী জোরপূর্বক স্কুলে প্রবেশ করিয়া ঐ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটায়। ইহাতে যাহারা আহত হইয়াছে তাহারা নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সন্ত্রাসীরা শিক্ষকদেরও গালিগালাজ করে এবং ধাক্কাধাক্কির চেষ্টা করে। এমতাবস্থায় ভয়ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় আতঙ্কে সকল শিক্ষার্থী স্কুল ছাড়িয়া বাহির হইয়া আসে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে কোনো সময় ক্লাসরুমে বা খেলার মাঠে ভুল বুঝাবুঝি এমনকি মারামারিও হইতে পারে। ইহা দেখিবার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রহিয়াছে। কিন্তু তাহা লইয়া ক্লাস চলাকালীন বহিরাগত সন্ত্রাসীদের এইরূপ হামলা মানিয়া নেওয়া যায় না।

গ্রামের স্কুলেও এমন হামলার নজির মব কালচারের বহিঃপ্রকাশ হইতে পারে। গত কয়েক বৎসর ধরিয়া আমরা লক্ষ করিতেছি যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপর হামলার ঘটনা প্রায়শ ঘটিয়া আসিতেছে। তাহারই পরিপ্রেক্ষিতে বহিরাগত সন্ত্রাসীরাও স্কুল-কলেজে হামলা চালাইবার দুঃসাহস দেখাইতে পারে। শিক্ষাঙ্গনে সর্বদা লেখাপড়ার শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশ থাকা প্রয়োজন। তাই টাঙ্গাইলের ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের গ্রেফতার করিয়া আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে।

উপরিউক্ত অনভিপ্রেত ঘটনায় সমাজে গভীর উদ্বেগ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নহে। প্রেমঘটিত এক তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করিয়া যেমন শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা ও মারামারি কাম নহে, তেমনি বহিরাগত লোকজনেরও তাহাতে জড়ানো অনুচিত। আমরা মনে করি, এই ঘটনা তুচ্ছ বলিয়া মনে হইলেও তুচ্ছ নহে। আবার ইহা কোনো বিচ্ছিন্ন বিশৃঙ্খলাও নহে। বরং ইহা আমাদের গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের নিরাপত্তার অভাব ও ভঙ্গুরতার কথা স্মরণ করাইয়া দেয়। এইসব বিদ্যালয়ের নিজস্ব নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা যেমন গড়িয়া তুলিতে হইবে, তেমনি স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধীদের দাপটও বন্ধ করিতে হইবে। এই জাতীয় তাণ্ডব কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনে গভীর ভীতির সঞ্চার করে এবং ইহাতে পাঠদানের স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট হয়। অভিভাবকগণ যদি তাহাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাইতে আতঙ্কবোধ করেন, তাহা হইলে সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থা এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হইবে। তাই শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতা ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা রক্ষায় কোনোরূপ শিথিলতা প্রদর্শন কাম্য নহে।

ইত্তেফাক/এনএন