মানুষের অধিকার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ন্যায়বিচার নিশ্চিত নুষের অধিকার ও সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ করার জন্যই আল্লাহ যুগে যুগে নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন। কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইনসাফ প্রতিষ্ঠার প্রতি জোর দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, 'হে মুমিনগণ, আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানে তোমরা অবিচল থেক। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার কর। এটি আল্লাহভীতির নিকটতর। আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে খবর রাখেন।' (সুরা মায়িদা: ৮)।
ইসলামি বিধানমতে, সমাজে ন্যায়বিচারের ধারা অব্যাহত রাখা ফরজে কেফায়া। মুসলিম সমাজের একটি অংশ মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত থাকলে অন্যরা দায়মুক্ত হয়ে যাবেন। নইলে সমাজে সবার ওপর ফরজ ত্যাগের দায় বর্তাবে। নবি দাউদ (আ.)-কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহতায়ালা বলেন, 'হে দাউদ, নিশ্চয় আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছি। সুতরাং তুমি মানুষের মধ্যে যথাযথভাবে বিচার কর।' (সুরা সোয়াদ: ২৬)।
আদর্শ বিচারকের বৈশিষ্ট্য: ন্যায়বিচারের সুফল যাতে জনগণ ভোগ করতে পারে, সে লক্ষ্যে ইসলাম বেশকিছু নির্দেশনা দিয়েছে। বিচারকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, বিচারপ্রার্থীকে তার কাছে পৌঁছাতে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হবে না। ইসলামের দৃষ্টিতে আদর্শ বিচারকের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যথা-১. বিচারক যেখানেই বিচার করুন না কেন, সেখানে সর্বসাধারণের প্রবেশের অনুমতি থাকতে হবে। ২. কারো কাছ থেকে কোনো ধরনের উপহার নিতে পারবেন না। ৩. কারো বিশেষ দাওয়াতে অংশ নিতে পারবেন না। ৪. সব বিষয়ে বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষের প্রতি সমতা নিশ্চিত করতে হবে। ৫. কোনো এক পক্ষের সঙ্গে গোপন আলাপ, উচ্চস্বরে কথাবার্তা বলা, মুখোমুখি হাসা, তাদের সম্মানার্থে দাঁড়ানো ইত্যাদি আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে। ৬. বিচারের মঞ্চে বসে ঠাট্টামশকরা করা যাবে না। ৭. আদালতে বিচারকের সামনে কোনো পক্ষই এমন কথা বলতে পারবে না, যা অন্য পক্ষ বুঝতে অপারগ। (ফতোয়ায়ে শামি, কিতাবুল কাজা)।
বিচারকের অনন্য মর্যাদা: ন্যায়পরায়ণ বিচারকের অনন্য মর্যাদা দিয়েছে ইসলাম। কোরআনে বিচারকাজকে নবি-রাসুলদের কাজ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা নিজেই ন্যায়পরায়ণ বিচারকদের ভালোবাসার কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, 'যখন তুমি বিচার কর, তখন তাদের মধ্যে ন্যায়ের সঙ্গে ফয়সালা কর। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়নিষ্ঠদের ভালোবাসেন।' (সুরা মায়িদা: ৫)। বিচারককে ন্যায়বিচার করার সাধ্যমতো চেষ্টা করতে হবে। তারপরও তার সিদ্ধান্তে ভুল হওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে দোষণীয় নয়। সিদ্ধান্ত সঠিক হোক কিংবা ভুল, আল্লাহ তাকে ন্যায়নিষ্ঠার প্রতিদান অবশ্যই দান করবেন। রসুল (স.) বলেন, 'কোনো বিচারক যখন বিচার করেন এবং বিচারকাজে (সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে) যথাযথ প্রচেষ্টা চালান। তার রায় সঠিক হয়, তবে তার জন্য দুটি নেকি থাকে। আর তিনি যখন বিচার করেন এবং বিচারকাজে যথাযথ প্রচেষ্টা চালান (ইজতিহাদ করেন) আর তার রায় ভুল হয়, তবে তার জন্য একটি নেকি লেখা হয়।' (বোখারি: ৭৩৫২)
পক্ষপাতদুষ্ট বিচারকের পরিণাম: ইসলামে বিচারকের মর্যাদা ঘোষণার পাশাপাশি সতর্কও করা হয়েছে। কারণ, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সমাজের অন্যতম স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আইনের যথাযথ প্রয়োগে বিচারকদের চৌকশ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিচারকার্যের স্পর্শকাতরতা উল্লেখ করে রসুল (স.) বলেন, 'যাকে মানুষের মধ্যে বিচারক বানানো হলো, তাকে ছুরি ছাড়া জবাই করা হলো।' (তোহফাতুল আহওয়াজি: ৪/৫০৫)। বিচারকাজে পক্ষপাতদুষ্ট হওয়া এবং অন্যায় ফয়সালা করা পরকালে কঠিন শাস্তির কারণ।
বিচারকরা তিন দলে বিভক্ত। একদল জান্নাতি এবং দুই দল জাহান্নামি। যে বিচারক সত্য জেনে সেই মোতাবেক ফয়সালা করে, তিনি জান্নাতি। আর যে বিচারক সত্য জানা সত্ত্বেও রায় প্রদানে অন্যায়ের আশ্রয় নেয়, সে জাহান্নামি। আর যে ব্যক্তি অজ্ঞ অবস্থায় বিচারকাজ সম্পাদন করে, সেও জাহান্নামি। তাই মুর্খ ও অযোগ্যদের বিচারক পদ গ্রহণ করা বৈধ নয়। বিশেষত বিচারকাজে নিযুক্ত ব্যক্তি অবশ্যই কোরআন-সুন্নাহ, ইসলামি আইনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে পূর্ববর্তী আলেমদের মতামত এবং কিয়াস (অন্য বিধানের আলোকে বিধান উদ্ভাবন) করার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করা জরুরি।
লেখক: সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ন্যশনাল এফ এফ ফাউন্ডেশন

