আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচিতে থাকা দেশগুলোর ওপর গত এক দশকে আগের তুলনায় অনেক বড় মাত্রায় সরকারি ব্যয় সংকোচন বা কৃচ্ছ্রসাধনের চাপ বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফাম।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, এ ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় সংকোচন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আবাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনসেবা খাতগুলোকে সংকুচিত করে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে আইএমএফের বর্তমান ঋণ শর্তগুলোতে সামাজিক খাতের সুরক্ষাব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেছে তারা।
অক্সফামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে আইএমএফের পক্ষ থেকে ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর জন্য নির্ধারিত কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যম বার্ষিক মাত্রা ছিল জিডিপির শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ। কিন্তু ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সেই হার চারগুণেরও বেশি বেড়ে জিডিপির শূন্য দশমিক শূন্য বা শূন্য দশমিক ৮৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
সংস্থাটির শঙ্কা, আইএমএফ হয়তো ১৯৮০-এর দশকের সেই কঠোর ‘কাঠামোগত সমন্বয়’ বা স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট কর্মসূচির দিকে ফিরে যাচ্ছে, যেখানে ধাপে ধাপে নয় বরং শুরুতেই এককালীন বড় ধরনের সরকারি ব্যয় কমাতে বাধ্য করা হয়। অক্সফামের আন্তর্জাতিক জ্যেষ্ঠ নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা নাবিল আবদো এই নীতির সমালোচনা করে বলেন, শুরুতেই কৃচ্ছ্রসাধনের এই চাপ এমন, যেন কোনো দেশকে একবারে পুরো বোতল বিষ পান করতে বলা হচ্ছে।
অন্যদিকে অক্সফামের এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির মুখপাত্র জুলি কোজাক জানিয়েছেন, তাদের প্রতিটি ঋণ কর্মসূচিতেই ‘সামাজিক ব্যয়ের সীমা’ বা ‘সোশ্যাল স্পেন্ডিং ফ্লোর’ অন্তর্ভুক্ত থাকে, যার মূল লক্ষ্য হলো ঝুঁকিপূর্ণ ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক ব্যয় সুরক্ষিত রাখা। এছাড়া কেবল ব্যয় কমানোর ওপর জোর না দিয়ে দেশগুলো কীভাবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব বা কর সংগ্রহ বাড়াতে পারে, সেদিকেও আইএমএফ কাজ করছে বলে জানান তিনি।
আইএমএফের এই বৈশ্বিক বিতর্ক বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের অর্থনৈতিক সংস্কার ও ঋণ সহায়তার আওতায় রয়েছে। দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের কাজ চলছে। আইএমএফের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে অপ্রয়োজনীয় মূলধনি ব্যয় কমানোর পরামর্শ দেওয়া হলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতগুলোকে অগ্রাধিকারমূলক সামাজিক ব্যয়ের আওতায় সুরক্ষিত রাখার কথা বলা হয়েছে।
চলতি ২০২৬ সালেও বাংলাদেশে রাজস্ব সংগ্রহ শক্তিশালী করার পাশাপাশি সীমিত সম্পদের মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ব্যয় বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় রয়েছে। ফলে আইএমএফের ঋণ ও সংস্কারের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনের মাত্রা কতটা হবে এবং সেই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও সেবাগুলো কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে—অক্সফামের এই প্রশ্নটি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

