পদ্মার চরাঞ্চলে বন্যা: পানিবন্দী মানুষ, সরিয়ে নিচ্ছেন বাড়িঘর 

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:৩০

উজান থেকে নেমে আসা পানি প্রবাহ এবং পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এতে উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের নিম্নভূমি ও বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ। অনেক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। এর ফলে নিচু এলাকার বাসিন্দাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে তাদের ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাঘা উপজেলার পদ্মার চরাঞ্চলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যার সৃষ্টি হয়। নদীর কূল ঘেঁষে জেগে ওঠা চরগুলোতে বসবাসকারী মানুষকে প্রতিবছরই বন্যার সঙ্গে লড়াই করে জীবনযাপন করতে হয়। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি অন্যত্র স্থানান্তর করেন। আবার অনেকে ঝুঁকি নিয়েই পানিবন্দী অবস্থায় বসবাস করতে বাধ্য হন।

এবারের বন্যায় চরাঞ্চলের বিভিন্ন ধরনের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। ইতোমধ্যে পানির নিচে চলে গেছে বিভিন্ন ফসলের জমি। ফলে কৃষিনির্ভর এসব পরিবারের আয়-রোজগারে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় রান্না-বান্না, বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ, গবাদিপশু পালন ও দৈনন্দিন চলা-ফেরায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন চরাঞ্চলের মানুষ।

চরাঞ্চলের বাসিন্দারা জানান, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নটিতে প্রায় ২০ হাজার মানুষের বসবাস। প্রতিবছর বন্যার সময় এসব মানুষকে নানা সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে নদীসংলগ্ন ও নিচু এলাকার পরিবারগুলোকে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পানি বাড়তে থাকায় অনেকেই ঘরবাড়ি ভেঙে মালামাল অন্যত্র সরিরে নিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে বন্যাকবলিত মানুষের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত একদিন আগে ১০০ পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তুলনায় এই ত্রাণের পরিমাণ অত্যন্ত অপ্রতুল। তাদের ভাষ্য, চরাঞ্চলে বিপুলসংখ্যক মানুষ বন্যাকবলিত হলেও মাত্র একশ পরিবারকে সরকারি ভাবে ত্রাণ দেওয়ায় অধিকাংশ পরিবার সহায়তার বাইরে থেকে গেছে।

লোকজন আরও জানান, শুধু চাল আর শুকনো খাবার বা সীমিত ত্রাণ বিতরণ করলেই তাদের সমস্যার সমাধান হবে না। বন্যাকবলিত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, গোখাদ্য ও জরুরি আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি সহায়তা ও পুনর্বাসন কর্মসূচি নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

চরবাসিদের ভাষ্য, বন্যার পানি আরও বাড়লে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন তারা। বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্কদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন পরিবারগুলোর সদস্যরা। গবাদিপশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন অনেকে।

চকরাজাপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আজিজুল আযম জানান, বন্যার্ত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা দ্রুত নিরূপণ করে পরিবারভিত্তিক ত্রাণ সহায়তা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

স্থানীয় বিএনপি নেতা জগলু শিকদার জানান, পদ্মার চরাঞ্চলের বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের প্রত্যাশা করছেন তিনি-সহ চরাঞ্চলবাসী।

বাঘা উপজেলা নির্বাহী অফিসার তকী ফয়সাল তালুকদার বলেন, নদীভাঙন ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১০০ পরিবারের মধ্যে ১৫ কেজি করে মোট ১ দশমিক ৫ মেট্রিক টন চাল দুদিন আগে বিতরণ করা হয়েছে। পানিবন্দী গ্রামের পরিবার-সহ অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছেও দ্রুত সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। সার্বিক পরিস্থিতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ইত্তেফাক/এপি