খুলনায় এতিমখানা, লিল্লাহ বোর্ডিং অর্থসংকটে

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০১৯, ২২:১২

কাঁচা চামড়ার নজিরবিহীন দরপতনের কারণে খুলনার এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলো তহবিল সংকটে পড়েছে। এতিমখানা ও মাদ্রাসার লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের ছাত্রদের থাকা-খাওয়ার অধিকাংশ ব্যয় নির্বাহ হয় কোরবানির ঈদের সংগ্রীহিত পশুর চামড়া ও বিভিন্ন মানুষের আর্থিক সাহায্য-সহযোগিতায়। তবে এ বছর কাঁচা চামড়ার দাম এতটাই নিম্নমুখী যে, কাঙ্ক্ষিত অর্থ উপার্জন তো দূরে থাক, চামড়া সংগ্রহ করতে গিয়ে যে ব্যয় হয়েছে তাও উঠে আসেনি। ফলে চলতি অর্থবছরে অর্থ সংকটে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলোতে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুলনা মহানগরীর পূর্ব বানিয়াখামার এলাকার জামেয়া মিল্লিয়া আরাবিয়া খাদেমুল ইসলাম মাদ্রাসা ও এতিমখানার লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে চার শতাধিক ছাত্রের বসবাস। এদের থাকা-খাওয়ার ব্যয় নির্বাহ করে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। এ অর্থের একটি বড় অংশ আসত কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করে। তবে এ বছর কাঁচা চামড়ার দাম নিম্নমুখী হওয়ার কারণে চলতি অর্থবছরে মাদ্রাসাটিতে তহবিল সংকটে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শুধুমাত্র নগরীর পূর্ব বানিয়াখামার এলাকার জামেয়া মিল্লিয়া আরাবিয়া খাদেমুল ইসলাম মাদ্রাসা ও এতিম খানাই নয়, কোরবানির চামড়ায় নজিরবিহীন দরপতনের কারণে খুলনা মহানগর ও জেলার শতাধিক মাদ্রাসার লিল্লাহ বোর্ডিংগুলোর চিত্রও একই। বিশেষ করে উপজেলা সদর ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার উপক্রম হয়েছে। চলতি বছরে এসব মাদ্রাসার লিল্লাহ বোর্ডিং চালাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হবে।

সূত্রমতে, অন্য বছর কোরবানির সময় যে গরুর চামড়া বিক্রি হতো আকার ভেদে ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত, কিন্তু এবার তা বিক্রি হয়েছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। এছাড়া ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে ২০-৩০ টাকায়। এ কারণে কেউ কেউ বিপাকে পড়ে নামমাত্র মূল্যে চামড়া বিক্রি করেছেন। আবার অনেকেই মাটিতে পুঁতে এবং নদীতে চামড়া ফেলে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এসব কারণে খুলনা আলিয়া কামিল মাদ্রাসা, দারুল উলূম মাদ্রাসা, দারুল কোরআন সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা, নেছারিয়া কামিল মাদ্রাসা, পশ্চিম বানিয়াখামার হাফিজিয়া মাদ্রাসা, বসুপাড়া এতিমখানাসহ নগরীর ছোটো-বড়ো মাদ্রাসাগুলোর লিল্লাহ বোর্ডিং পরিচালনায় চলতি বছর তহবিল সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পূর্ব বানিয়াখামার এলাকার জামেয়া মিল্লিয়া আরাবিয়া খাদেমুল ইসলাম মাদ্রাসা ও এতিম খানার প্রিন্সিপ্যাল মাওলানা শেখ আব্দুল্লাহ বলেন, ‘কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করে এতিমখানার লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের ছাত্রদের লেখাপড়া, থাকা-খাওয়ার ব্যয়ের একটি বড় অংশের জোগান হতো। কিন্তু এ বছর পশুর চামড়া থেকে অর্থ উপার্জন তেমন হয়নি। উলটো চামড়া সংগ্রহ করতে গিয়ে তহবিলের টাকা গচ্চা গেছে।’

তিনি জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও তার মাদ্রাসায় ছয় শতাধিক গরু-ছাগলের চামড়া দান করেছেন এলাকার মানুষ। এর মধ্যে ৩৮টি চামড়া ৬ হাজার ৩০০ টাকা এবং ১৯টি চামড়া মাত্র ৬০০ টাকায় বিক্রি করতে পেরেছেন। বাকি ৫৯৪টি চামড়া খুলনার একটি ট্যানারিতে বাকিতে দিয়েছেন। সেখান থেকে মোটামুটি অর্থ পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। এসব চামড়া সংগ্রহ করতে ৫০০ ছাত্র-শিক্ষক মাঠে-ময়দানে কাজ করেছে। এছাড়া চামড়া সংগ্রহ করতে পরিবহনসহ অন্যান্য খাতে বেশ অর্থ ব্যয়ও হয়েছে।

মাওলানা শেখ আব্দুল্লাহ আরো বলেন, বিগত বছরগুলোতে কোরবানির পশুর চামড়ার বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের তিন-চার মাসের ব্যয় নির্বাহ হতো। কিন্তু এবার এক মাসের খরচও উঠবে না।

মদিনা নগর কওমিয়া মাদ্রাসা ইতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের প্রধান শিক্ষক মাওলানা মো. কামাল হোসেন বলেন, তার প্রতিষ্ঠানে ৭০ জন ছাত্র লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে খাওয়া-দাওয়া করে। যেখানে বছরে প্রায় ৮-১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। কোরবানির পশুর চামড়ার বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের চার-পাঁচ মাসের ব্যয় নির্বাহ হতো। বিশেষ করে বছরের অন্যান্য সময়ে চাল-ডাল বাবদ নেওয়া বকেয়া অর্থও চামড়ার টাকা দিয়ে মেটানো হতো। কিন্তু এবার কোনো আয়ই হয়নি।

তিনি বলেন, কোরবানির ঈদের দিন প্রায় ৯৫টি চামড়া সংগ্রহ করেন। যা বিক্রি হয়েছে মাত্র ১৬ হাজার টাকা। দ্বিতীয় দিন ১৫ পিস চামড়া মাত্র ১শ’ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কিন্তু ছাত্র-শিক্ষক মিলে ২০ জনের একটি টিমের চামড়া সংগ্রহ, পরিবহন এবং অন্যান্য বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ হাজার টাকা। এ ব্যয়ের টাকাই ওঠেনি।

নগরীর লবণচরার আহমদিয়া এতিমখানা ও মাদ্রাসার শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘খুলনায় এবার চামড়ার কোনো দামই নেই। তিনি পাঁচটি গরু ও একটি ছাগলের চামড়া মাত্র ৪৫০ টাকা বিক্রি করেছেন। যাতে রিকশা ভাড়াও ওঠেনি।’

এদিকে কওমি মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চামড়ার নজিরবিহীন মূল্যহ্রাসে এবার সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে বিভিন্ন এতিমখানা ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। এতিমখানা ও মাদ্রাসার খরচের একটি বড় অংশের জোগান আসে ঈদুল আজহায় পাওয়া চামড়া বিক্রি করে। এবার চামড়ার দাম না পাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে এসব প্রতিষ্ঠান।