শিক্ষার মেরুদণ্ডেই যদি পচন ধরে!

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩০

'শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড'-এই বহুল উচ্চারিত কথাটি আমরা যত সহজে বলি, তাহার গভীরতা হয়তো-বা ততটা উপলব্ধি করি না। একটি জাতির আগামী দিনের শক্তি, মেধা, নৈতিকতা ও নেতৃত্বের বীজ রোপিত হয় শিক্ষাঙ্গনে। সেই জাতি ভবিষ্যতের পথে কতটা দৃঢ় পদক্ষেপে আগাইবে, উহা অনেকাংশেই নির্ভর করে তাহার মেরুদণ্ড, তথা শিক্ষাব্যবস্থার উপর। তবে সেই মেরুদণ্ডেই যদি অবহেলা, অনিয়ম ও অনাস্থার সংক্রমণ দেখা দেয়, তাহা হইলে চিত্রটি কেমন হইবে? সেই শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ফল তৈরির প্রক্রিয়া নিয়েই যদি অনিয়ম, অবহেলা ও অসংগতির অভিযোগ উঠিতে থাকে, তাহা হইলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার যথেষ্ট কারণ রহিয়া যায়।

এই বারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল পুনর্নিরীক্ষণের জন্য বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী আবেদন করে। পুনর্নিরীক্ষণে ৪ হাজার ৫৮৫ জন অকৃতকার্য শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হইয়াছে, নূতন করিয়া জিপিএ-৫ পাইয়াছে ৩ হাজার ৭৯ জন; নম্বর পরিবর্তিত হইয়াছে ৫৬ হাজার ২৫৯ জনের এবং গ্রেড বা জিপিএ পরিবর্তিত হইয়াছে ২৭ হাজার ৮৩৬ জনের। প্রশ্ন হইল, ফল প্রকাশের পরই এত বিপুলসংখ্যক সংশোধনের প্রয়োজন হইল কেন? আরো বড় প্রশ্ন, ভুল যদি এত ব্যাপক হয়, তাহা হইলে প্রাথমিক মূল্যায়ন ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা কোথায়? মানুষ ভুলের উর্ধ্বে নহে। সেই কারণেই পুনর্নিরীক্ষণের ব্যবস্থা থাকে। তথাপি পুনর্নিরীক্ষণ যদি নিয়মিতভাবে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তনের কারণ হয়, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে, মূল মূল্যায়ন ব্যবস্থার কোথাও না কোথাও গুরুতর দুর্বলতা রহিয়াছে। উদ্বেগের আরো কারণ, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে উত্তরপত্রের নম্বর ও প্রকাশিত ফলাফলের মধ্যে অমিলের অভিযোগ সামনে আসিয়াছে। একটি খাতায় প্রাপ্তনম্বর শূন্য থাকিলেও প্রকাশিত ফলে ৪৫ নম্বর দেখানোর অভিযোগ তদন্তের মুখে পড়িয়াছে। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডেও পুনর্নিরীক্ষণের পর পরীক্ষকদের ডাকিয়া উত্তরপত্র পুনরায় যাচাই এবং নম্বর বাড়ানোর জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠিয়াছে। অভিযোগগুলির সত্যতা তদন্তে নির্ধারিত হইবে নিশ্চয়ই। কিন্তু এমন অভিযোগ যে উঠিতেছে, তাহাই কি যথেষ্ট অস্বস্তির কারণ নহে? একজন শিক্ষার্থী ১০ বৎসর পড়াশোনা করিয়া যেই ফলের অপেক্ষায় থাকে, একটি ভুল মূল্যায়ন তাহার উচ্চশিক্ষার পথ বদলাইয়া দিতে পারে। একটি নম্বরের হেরফের কখনো কখনো একটি জীবনের গতিপথও বদলাইয়া দেয়।

উন্নত বিশ্বে আমরা কী দেখি? উচ্চঝুঁকির পরীক্ষার মূল্যায়নকে সেইখানে কেবল ব্যক্তিনির্ভর রাখিয়া দেওয়া হয় না। বরং পরীক্ষকদের প্রশিক্ষণ, নির্ধারিত মূল্যায়ন-মানদণ্ড, নমুনা উত্তরপত্রের মাধ্যমে মান যাচাই, দ্বিতীয় পর্যায়ের নিরীক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ফল প্রক্রিয়াকরণ এবং অস্বাভাবিক নম্বরের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকে। কোনো একটি পরীক্ষকের ভুল বা অসততা যেন একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের নির্ধারক হইয়া উঠিতে না পারে-ব্যবস্থাটিকে সেইভাবেই সাজানো হয়। সুতরাং, উত্তরপত্র মূল্যায়নে কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষকদের জবাবদিহি, ডিজিটাল নিরীক্ষা, অস্বাভাবিক ফল শনাক্তে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে হইবে। ইচ্ছাকৃত অনিয়ম প্রমাণিত হইলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও নিশ্চিত করিতে হইবে। বেদনাদায়ক বিষয় হইল, কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার পর কয়েক জন শিক্ষার্থীর করুণ মৃত্যু। এই জন্য সংশ্লিষ্টদের ভাবিতে হইবে, ভুল বা অনিয়মের কারণে যেন কোনো শিক্ষার্থী অন্যায্যভাবে নিজের ভবিষ্যৎ হারাইয়া না ফেলে।

শিক্ষা নামক মেরুদণ্ডের গোড়াতেই যদি অবহেলা ও অনিয়মের পচন ধরিয়া থাকে, তাহা হইলে কেবল নূতন পাঠ্যক্রম, পরীক্ষাপদ্ধতি, নীতিমালা পরিবর্তন কিংবা শিক্ষা কমিশন গঠন করিয়া লাভ কী? অর্থাৎ, শিক্ষাক্ষেত্রে ঘনীভূত এই অবিশ্বাসের কালো ছায়া দূর করিতে কেবল দায়সারা তদন্ত নহে, বরং প্রয়োজন প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, দায়ীদের জবাবদিহি এবং পুরো মূল্যায়ন ব্যবস্থায় বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার। আমরা যেন ভুলিয়া না যাই, পরীক্ষার খাতায় শুধু নম্বর লেখা থাকে না, বরং সেইখানে লেখা থাকে একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের সঙ্গে প্রতারণা কোনোভাবেই বরদাশত করা হইবে না।

ইত্তেফাক/এএম