বিশ্ববাজারে হুহু করিয়া বাড়িতেছে জ্বালানি তৈলের মূল্য। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হইয়া যাওয়া এবং লোহিতসাগরের বাব আল মানদেবে তৈল সরবরাহ লইয়া অনিশ্চয়তায় তৈলের মূল্য এখন ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। ইহাতে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বাড়িয়াছে এবং মার্কিন বন্ডের সুদের হার ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছাইয়াছে। ইত্তেফাকের খবর অনুযায়ী— মধ্যপ্রাচ্যে নূতন করিয়া যুদ্ধ-উন্মাদনা ও উত্তেজনা বাড়ায় তৈলের মূল্য ইতিমধ্যে প্রতি ব্যারেল ১০৮ ডলার ছাড়াইয়া গিয়াছে। অয়েল প্রাইজ ডট কমের তথ্য হইতে জানা যায়, ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ বাড়িয়া ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলার ৭৪ সেন্টে উঠিয়াছে।
উল্লেখ্য, সৌদি আরবের তৈল অবকাঠামোয় হুতিরা নূতন করিয়া হামলা করিয়াছে। ইহা ছাড়া উপসাগরের জাহাজে হামলা করিয়াছে ইরান। এই সকল ঘটনায় বিশ্ববাজারে তৈল সরবরাহ লইয়া বাড়িয়াছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। হুতিদের হামলার জেরে সৌদি আরবের এক তৈল পাইপলাইন বন্ধ হইয়া যাওয়ায় গত সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তৈলের মূল্য ৩ শতাংশের অধিক বৃদ্ধি পায়। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ তৈল আমদানিকারক দেশসমূহের ব্যয় বাড়িয়া যাইবে। জ্বালানি তৈলের মূল্য বাড়িলে বিদ্যুৎ হইতে শুরু করিয়া পরিবহন ব্যয়সহ প্রায় সকল কিছুর মূল্য বৃদ্ধি পাইবে অস্বাভাবিকভাবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে দেখা দিবে অস্থিরতা। তাহাতে মূল্যস্ফীতির হার বাড়িয়া যাইবে এবং সাধারণ মানুষের উঠিবে নাভিশ্বাস। ইতিমধ্যে ইত্তেফাকের আরেক খবরে বলা হইয়াছে, তিন গুণ অধিক মূল্যে এলএনজি কিনিতেছে সরকার। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশ পড়িয়াছে বিপাকে। তাই এই সমস্যা কাটাইয়া উঠিবার জন্য বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক। একদিকে সরকারকে জ্বালানির সাপ্লাই লাইন স্বাভাবিক রাখিতে হইবে। অন্যদিকে যথাসম্ভব জ্বালানি সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করিতে হইবে। আপৎকালীন সকলকে বুঝাইতে হইবে যে, বিদ্যুৎসহ কোনো প্রকার জ্বালানির যেন অপচয় না হয়। এই জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি বিশেষ নির্দেশনা জারি করা যাইতে পারে। আবার শহর-গ্রাম সর্বত্র জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থায় যতটা পারা যায় সমতা ও নায্যতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করিতে হইবে যাহাতে জন-অসন্তোষ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
বিশ্ববাজারে তৈলের অগ্নিমূল্যের এই অভিঘাতে বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যে জন-অসন্তোষ ছড়াইয়া পড়িয়াছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়ায় শুরু হইয়াছে ব্যাপক গণবিক্ষোভ। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় পেট্রোল ও ডিজেলের মূল্য যথাক্রমে ২৮ ও ৪০ শতাংশ বাড়াইয়াছে। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে সিরিয়ার হামা, খান শেইখুন ও মারাত আল নুমান শহরে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গিয়াছে। রাজধানী দামেস্কসহ ইদলিব, আলেপ্পো, দেইর এজ-জের ও হাছাকাহ অঞ্চলের মানুষও নামিয়া আসিয়াছে রাজপথে। সিরিয়া ছাড়াও আয়ারল্যান্ডসহ ইউরোপের কিছু দেশেও পরিবহন খাতের শ্রমিক ও সাধারণ জনগণ জ্বালানির বর্ধিত কর ও মূল্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করিয়াছে। এমনকি এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া ও আফ্রিকার কোমোরেসের মতো দেশেও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির সহিত জ্বালানি মূল্যের তীব্র অভিঘাত যুক্ত হওয়ায় মাথাচাড়া দিয়া উঠিয়াছে গণঅসন্তোষ। এই বিক্ষোভ বিশ্বব্যাপী গভীর অর্থনৈতিক সংকটের নির্দেশক। এমন উদ্ভূত পরিস্থিতি বাংলাদেশ সরকারের উচিত সতর্কতা অবলম্বন করা এবং জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় আশু ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
উপর্যুক্ত সংকট মোকাবিলায় জ্বালানির বিকল্প সরবরাহকারী দেশসমূহের সহিত জরুরি ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদন এবং দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তি পুনর্বিন্যাসপূর্বক সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা দরকার। শিল্পকলকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত রাখিতে অপচয়মূলক আলোকসজ্জা ও অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক। ইহার পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কৃচ্ছ্রসাধনের পাশাপাশি অবৈধ গ্যাস ও জ্বালানিসংযোগ বিচ্ছিন্ন করিতে প্রয়োজনে অভিযান পরিচালনা করিতে হইবে। ইহা ছাড়া আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা হ্রাসপূর্বক নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দেশীয় স্থল ও সমুদ্রভাগে গ্যাস অন্বেষণ কার্যক্রম জোরদার করিতে হইবে। সরকারকে অবশ্যই আপৎকালীন অগ্রাধিকার নির্ধারণ করিতে হইবে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে স্বাভাবিক রাখিতে গ্রহণ করিতে হইবে সর্বাত্মক উদ্যোগ।

