ময়মনসিংহ মেডিকেল

পাঁচ সিঁড়ির চারটিই বন্ধ ছিল, মৃত্যু নিয়ে ধূম্রজাল

অগ্নিকাণ্ডের সময় পদদলিত হয়ে ছয় জন মারা গেছে—জানিয়েছিল পুলিশ, পরে বিভাগীয় কমিশনার জানালেন মৃতের সংখ্যা ৪, তবে পদদলিত হয়ে নয়, তদন্ত কমিটি গঠন

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৯

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার সকালে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, আগামী তিন কার্য দিবসের তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে কমিটিকে। এদিকে অগ্নিকাণ্ডে পদদলিত হয়ে ছয় জনের মৃত্যুর খবর নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের পর পদদলিত হয়ে ছয় জনের মৃত্যুর খবর সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার। তিনি সোমবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তবে এর আগে ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন একটিমাত্র সিঁড়ি দিয়ে আতঙ্কে তাড়াহুড়া করে বের হওয়াতে পদদলিত হয়ে শিশুসহ ছয় জন মারা গেছেন বলে সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন।

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের সময় নতুন ভবনের পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে চারটিতেই তালা লাগানো ছিল। সোমবার বিকালে ঐ অগ্নিকাণ্ডের পর রোগী ও স্বজনেরা নিচে নামতে গিয়ে এসব সিঁড়ি ব্যবহার করতে পারেননি। আতঙ্কিত রোগী ও স্বজনেরা একটি সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করায় ভোগান্তি ও হতাহতের ঘটনা বেড়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

বিভাগীয় কমিশনার যা বললেন : প্রেস ব্রিফিংয়ে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, হাসপাতালে পদদলিত হয়ে কেউ মারা গেছেন—এমন প্রমাণ তিনি এখনো পর্যন্ত পাননি। এ ধরনের কোনো প্রমাণ পেলে তিনি সেটা যাচাই করে দেখবেন। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় চার জনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছি। তালিকায় উঠে আসা মৃত একজন এখনো জীবিত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাকি চার জনের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে তাদের পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন। অন্য দুজনের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্তের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।

সিঁড়ি তালাবদ্ধ থাকায় ক্ষোভ : হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের সময় পদদলিত হয়ে মারা যাওয়া একজনের স্বজনের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। নিহত রমজান আলীর ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, তার ভাই এমনিতেই হার্টের রোগী ছিলেন। একটি সিঁড়ি দিয়ে সবাই হুড়াহুড়ি করে চারতলা থেকে নামার সময় ধাক্কাধাক্কির মধ্যে পড়ে গিয়ে সেখানেই মারা গেছেন তিনি। তার দাবি, ‘হাসপাতালের পাঁচটা সিঁড়ির মধ্যে চারটাই বন্ধ ছিল। লিফটও কার্যকর ছিল না। সিঁড়িগুলো চালু থাকলে এমন অবস্থা হতো না। এ জন্য আমরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেই দায়ী মনে করি।’

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মারা গেছেন ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের শহীদুল ইসলামের স্ত্রী কুলসুমা (৩৫)। কুলসুমার ননদ নাজমা আক্তার বলেন, তার ১২ বছরের ভাতিজা স্বাধীন হাসপাতালের নতুন ভবনের ষষ্ঠ তলায় ভর্তি ছিল। সন্ধ্যায় হঠাত্ আগুন দেখা যায়। প্রচণ্ড ধোঁয়া ষষ্ঠ তলায় প্রবেশ করে। এতে হাসপাতালের রোগী ও তাদের স্বজনরা আতঙ্কিত হয়ে হুড়াহুড়ি করে একটি সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নিচে নামতে থাকেন। এ সময় কুলসুমাও তার ছেলে স্বাধীন ও মেয়ে মীমকে নিয়ে নিচে নামতে থাকেন। ষষ্ঠ তলা থেকে চার তলা পর্যন্ত আসতেই হঠাত্ কুলসুমা পড়ে যান। এ সময় পেট, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পান তিনি। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই কুলসুমা মারা যান। গতকাল সকাল ১০টায় বালিখা গ্রামে জানাজা শেষে কুলসুমার মরদেহ নিজ বাড়ির আঙিনায় দাফন করা হয়।

নিহত শাহাজাহান মনির ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর গ্রামের নাজিমুল্লাহর ছেলে। পেশায় পল্লিচিকিৎসক শাহাজাহান ১০ থেকে ১২ দিন ধরে হাসপাতালের নতুন ভবনে যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। স্বজনদের দাবি, সোমবার সন্ধ্যায় হাসপাতালের লিফটে আগুন লাগার পর সিঁড়ি দিয়ে স্ত্রী ও স্ত্রীর বড় বোনের সঙ্গে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়ে শাহাজাহান মনিরের মৃত্যু হয়। পরদিন বেলা ১১টায় বাড়ির আঙিনায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে শাহাজাহানের মরদেহের দাফন হয়। ঘটনার সময় শাহাজাহান মনিরের সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী হারিসা বেগম। তিনি বলেন, ‘রোগীরে নিয়া এক সিঁড়ির দুই-তিন ধাপ নামার পরেই পইড়া গেছি। পরে আমি অজ্ঞান হইয়া যাই। যহন হুঁশ হইছে, তহন দেহি মাইনষে কান্দাকাটি করতাছে। মানুষের পাড়ায় পিষ্ট হইয়া আমার মানুষটা মারা গেছে।’

সিঁড়ি কেন বন্ধ ছিল—জানতে চাইলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, নিরাপত্তার কারণে সিঁড়ি চারটি বন্ধ রাখা হয়। তবে বন্ধ থাকা চার সিঁড়ি গতকাল খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবে।

লিফটের ক্যাবল বেয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে : আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুত্সুদ্দী বলেন, লিফটের কন্ট্রোল বোর্ড ও বিদ্যুত্ সরবরাহের অংশে আগুনের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত তাপের কারণে সেখানে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে বলে তার ধারণা। লিফটের ক্যাব‌লের মধ্যে আগুন লেগে তা ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং আগুনের বিস্তার ঘটতে পারে। হাসপাতালের সব সিঁড়ি খোলা থাকলে রোগী ও স্বজনেরা সহজে নিচে নামতে পারতেন।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ, রেঞ্জ ডিআইজি মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান, ময়মনসিংহ সিটি প্রশাসক রুকনোজ্জামান, ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন।

ইত্তেফাক/এনএন