বর্তমান বাজার মূল্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বিনা মূল্যের পাঠ্যবইয়ের প্রতি ফর্মা ছাপাতে খরচ ২ টাকা ৪০ পয়সা। তবে ৩ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৩ টাকা ৫৭ পয়সায় প্রতি ফর্মা ছাপানোর কাজ পেয়েছে ১৩৩টি ছাপাখানা। সঠিক মান বজায় রেখে প্রায় ১ হাজার কোটি ফর্মার পাঠ্যবই ছাপালে ছাপাখানাগুলোর আয় হবে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। তবে ছাপাখানার জনবলসহ অন্যান্য খরচ সর্বোচ্চ ৪০০ কোটি টাকা ধরা হলে নিট মুনাফা হবে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। তার পরও অতি মুনাফার লোভে নিম্নমানের বই ছাপার যেন মহোত্সব চলছে।
অধিকাংশ ছাপাখানার ২০২৭ সালের ছাপানো পাঠ্যবইয়ে প্রথম ১০ পাতা চকচকে, ভেতরের ১০০ পাতা খসখসে। অর্থাত্ প্রথম ১০ পাতায় ভালো মানের কাগজ ব্যবহার করা হলেও ভেতরের পাতাগুলোতে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘মিনিস্ট্রি টিম’, এনসিটিবির পরিদর্শন টিম ও দুই ইন্সপেকশন এজেন্ট সম্প্রতি শতাধিক ছাপাখানায় সরেজমিন পরিদর্শন করে নিম্নমানের পাঠ্যবই ছাপার এই নতুন কৌশল চিহ্নিত করেছে। গত এক সপ্তাহে ৫৫টি ছাপাখানার পাঠ্যবইয়ের আরো ৩ কোটি নিম্নমানের ফর্মা কেটে বিনষ্ট করা হয়েছে। এছাড়া গুরুতর অনিয়মে জড়িত ১৫ ছাপাখানাকে শোকজ করেছে এনসিটিবি। এর আগে ৫২ ছাপাখানার পাঠ্যবইয়ের নিম্নমানের ১ কোটি ফর্মা কেটে বিনষ্ট করা হয়। সব মিলিয়ে ৪ কোটি ফর্মা কাটা হলো।
জানা গেছে, গুরুতর অনিয়মে জড়িত থাকায় দায়ে এনসিটিবি থেকে শোকজ পাওয়া ছাপাখানাগুলো হলো মোল্লা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন, অটো প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, আনন্দ প্রিন্টার্স লিমিটেড, রেদওয়ানী প্রেস, লেটার অ্যান্ড কালার, লিখন আর্ট প্রেস, সাগরিকা, ফরায়েজি প্রেস, দোয়েল, অ্যারিস্ট্রোক্রাটস সিকিউরিটি অ্যান্ড প্যাকেজিং, টাঙ্গাইল অফসেট প্রেস, মেসার্স মুত্তাহিদা প্রিন্টার্স, শৈলী প্রেস, ভাই ভাই প্রিন্টিং প্রেস ও রাব্বিল প্রিন্টার। এর মধ্যে আনন্দ প্রেস, সরকার প্রেস, রেদওয়ানী ও টাঙ্গাইল অফসেট প্রেসকে দুই বার করে শোকজ নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, ছাপাখানাগুলোর অনুমোদন দেওয়া কাগজের স্যাম্পল গোপনে সায়েন্স ল্যাবরেটরি ল্যাবে পরীক্ষা করে এনসিটিবি। ল্যাব পরীক্ষায় নিম্নমানের কাগজ অনুমোদন দেওয়ার প্রমাণ মেলেনি। তবে অনুমোদিত কাগজে পাঠ্যবই না ছাপিয়ে, নিম্নমানের কাগজে পাঠ্যবই ছাপানোর বিষয়টি হাতেনাতে ধরেছে এনসিটিবি।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক আবু নাসের টুকু গতকাল ইত্তেফাককে জানান, পাঠ্যবইয়ে ব্যবহূত প্রথম কয়েক পৃষ্ঠায় জিএসএম (কাগজের ওজন) সঠিক পাওয়া যাচ্ছে। পরের পৃষ্ঠাগুলোতে জিএসএম কম পাওয়া ঘটনা ধরা পড়েছে। এনসিটিবির আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সঠিকভাবে পিডিআই (প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন) করা হচ্ছে কি না, দেখার দায়িত্ব এনসিটিবির মনিটরিং কমিটির। পাঠ্যবইয়ের মান ঠিক রাখতে এবার কঠোর অবস্থানে রয়েছে এনসিটিবি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গোপনে ছাপাখানাগুলোতে নিম্নমানের কাগজ সরবরাহ করছে বিসমিল্লাহ পেপার হাউজ। শুধু তাই নয়, বিসমিল্লাহ পেপার হাউজের মালিক মিন্টু মোল্লার (ওরফে কালা মিন্টু) রয়েছে একাধিক গোপন ছাপাখানা। এসব গোপন ছাপাখানা থেকে ২০টির অধিক ছাপাখানা নিম্নমানের বই ছাপায়। শুধু তাই নয়, এনসিটিবির পাঠ্যবই ছাপাতে দুটি ছাপাখানার মালিকও হয়েছেন মিন্টু মোল্লা। তার ছাপাখানা দুটি হলো মোল্লা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন এবং অটো প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং। ২০২৭ সালের জন্য ১০০ কোটি টাকার বেশি পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ পেয়েছে এই দুটি প্রেস। সম্প্রতি এই দুটি প্রেসে সরজমিনে গিয়ে নিম্নমানের পাঠ্যবই ছাপানোর প্রমাণ হাতেনাতে ধরেছে ‘মিনিস্ট্রি টিম’ ও এনসিটিবির ইন্সপেকশন এজেন্ট। এসব বই ও নিম্নমানের কালি বিনষ্ট করা হয়েছে। গত ১৬ বছর ধরে নিম্নমানের কাগজ সরবরাহ করে শত শত কোটি টাকার মালিক হওয়া ছাপাখানা জগতের আলোচিত-সমালোচিত ‘কালা মিন্টু’কে ডেকে গত ১৭ সেপ্টেম্বর এনসিটিবিতে তলব করে সতর্ক করে দেন শিক্ষামন্ত্রী। কিন্তু তার পরও তিনি নিম্নমানের পাঠ্যবই ছাপানো অব্যাহত রাখেন। এ কারণে গত সপ্তাহে তার কাছে শোকজ নোটিশ পাঠিয়েছে এনসিটিবি।
মাতুয়াইলের পাঁচটি ছাপাখানার মালিক গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘কালা মিন্টু ভাই যে নিম্নমানের কাগজ সরবরাহ করে তার প্রতি টন বর্তমান বাজার মূল্য ৯০ হাজার টাকা। তিনি ছাপাখানাগুলোর মালিকদের কাছ থেকে নেন ১ লাখ টাকা। অথচ পাঠ্যবইয়ের সঠিক মানের কাগজের প্রতি টন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। অনেক প্রেসকে কালা মিন্টু ভাইয়ের মালিকাধীন বিসমিল্লাহ পেপার হাউজ থেকে কাগজ কিনতে বাধ্য করা হয় বলে দুটি ছাপাখানার মালিক অভিযোগ করেন। বিষয়টি জানতে মিন্টু মোল্লার মোবাইল ফোনে একাধিক ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
প্রসঙ্গত, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের মোট পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ৮ কোটি ১৯ লাখ ৭৮ হাজার ৩৫১ কপি। এর মধ্যে ছাপা হয়েছে ৫১ ভাগ। গতকাল পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়েছে ১ কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার ২৯১ কপি বই। অর্থাত্ প্রাথমিকের মোট পাঠ্যবইয়ের ২৩.৮২ শতাংশ বই সরবরাহ করা হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরে ২২ কোটির বেশি বই ছাপানোর কাজ গত এক মাস ধরে পুরোদমে শুরু হয়েছে। কিন্তু সরবরাহ করা বইয়ের সংখ্যা মাত্র ২.৫২ ভাগ। এত কম অগ্রগতির নেপথ্যে এনসিটিবির অদক্ষ জনবল ও আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
