ইরানে ওষুধের দাম আকাশছোঁয়া, রোগীরা বিপাকে

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:৫৫

যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ ও কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের ওষুধ শিল্প মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর জেরে দেশটিতে ওষুধের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে এবং কিছু চিকিৎসা সামগ্রী পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠায় রোগী ও তাদের পরিবারগুলো চরম বিপাকে পড়েছেন।

আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির চলমান যুদ্ধের সাত মাসের মাথায় সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়ে কিছু ওষুধের দাম তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে। বেকারত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি মুদ্রার মান চলতি সপ্তাহে সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং এর মূল্য অর্ধেক কমে গেছে। এর মধ্যেই খাদ্যসহ অন্যান্য পণ্যের দামও আকাশচুম্বী হয়েছে।

এই যুদ্ধ এখন একটি অর্থনৈতিক সহনশীলতার পরীক্ষায় রূপ নিয়েছে। ইরান এই অঞ্চলে তেলবাহী জাহাজে হামলার মাধ্যমে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র গত জুন থেকে দেশটির বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে এবং একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইরানের অর্থনীতিকে ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়েছে।

আমদানি নির্ভরতার কারণে ইরানের ওষুধ শিল্প অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখন পর্যন্ত ইরানের হাসপাতালগুলোতে বড় ধরনের ওষুধ সংকটের বড় কোনও লক্ষণ দেখা না গেলেও সাধারণ ফার্মেসিগুলোতে এর সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

তেহরানের একজন ওয়েল্ডার গোলামরেজা রহমানি এবং তার স্ত্রী সম্প্রতি তাদের ১২ বছর বয়সী পেটে সমস্যায় ভোগা মেয়ের জন্য চারটি ওষুধের প্রেসক্রিপশন সংগ্রহ করতে দুই দিন ধরে বেশ কয়েকটি ফার্মেসি চষে বেড়িয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ফার্মেসিতে এক বা দুটি ওষুধ পাওয়া যাচ্ছিল, সব একসঙ্গে নয়’। তিনি জানান, তারা একটি ওষুধ কোথাও খুঁজে পাননি। এই খোঁজাখুঁজির কারণে তাকে দুই দিন কাজে যেতে না হওয়ায় কাজের মজুরিও হারাতে হয়েছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরান তার চাহিদার ৮০ শতাংশেরও বেশি ওষুধ দেশেই উৎপাদন করে, তবে এর অনেকগুলোর জন্য আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভর করতে হয়। তেহরান ফার্মাসিউটিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য বাহমান সাবুর স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, যুদ্ধের আগে বেশিরভাগ ওষুধ ও ঔষধি উপাদান সমুদ্রপথে আনা হতো, তবে মার্কিন নৌ-অবরোধ সেই জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে।

মেডিকেল আমদানিকারকরা অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল আকাশপথে রুট পরিবর্তন করেছিলেন। কিন্তু ইরানের বেশ কয়েকটি এয়ারলাইনসের ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই প্রবেশাধিকারও হুমকির মুখে পড়েছে, যার ফলে কিছু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের এসেক্স ইউনিভার্সিটির স্কুল অব হেলথ অ্যান্ড সোশ্যাল কেয়ারের অধ্যাপক রেজা মাজেদজাদেহ বলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলো সরাসরি ওষুধকে লক্ষ্য করে দেওয়া হয়নি, তবে বছরের পর বছর ধরে বলবৎ থাকা আর্থিক নিষেধাজ্ঞাগুলোও ওষুধের সরবরাহকে ব্যাহত করছে। কারণ আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও কোম্পানিগুলো নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ার আশঙ্কায় অতিরিক্ত সতর্ক থাকে এবং লেনদেন করতে অস্বীকার করে।

তিনি বলেন, ইরানের কাছে ওষুধ বিক্রি করা সম্পূর্ণ বৈধ হতে পারে, কিন্তু কোনও ব্যাংক পেমেন্ট প্রসেস করতে অস্বীকার করতে পারে। একটি ফার্মাসিউটিক্যাল বা শিপিং কোম্পানি কেবল এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে ইরানের সঙ্গে লেনদেন করা ঝুকিপূর্ণ। লেনদেন কাগজে-কলমে বৈধ হলেও বাস্তব দুনিয়ায় তা ঘটে না।

ওষুধের উৎপাদন কতটা কমেছে তা ইরানি সরকার জানায়নি। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, বিমান হামলায় ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধ প্রস্তুতকারকসহ ৪০টির বেশি ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।

এছাড়া, নগদ সংকটগ্রস্ত ফার্মেসিগুলো অনেক সময়ওষুধ মজুত রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। সংসদীয় স্বাস্থ্য কমিটির সদস্য মোহাম্মদ জামালিয়াট বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতির’ কারণে বিমা কোম্পানিগুলো ফার্মেসিগুলোকে ওষুধ কভারেজের অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে নয় মাস পর্যন্ত পিছিয়ে পড়েছে। 

সূত্র: এপি

 

 

 

 

ইত্তেফাক/পিএস