চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে ব্যস্ত নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও এর ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) ১৫ বছরের জন্য একটি আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটরের কাছে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার খসড়া চুক্তিতে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের ভিত্তিতে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। ‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং ওভারফ্লো ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কাঠামোর আওতায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে নৌপরিবহন সচিব জাকারিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, পর্যালোচনার জন্য প্রস্তাবটি কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে। কমিটির নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছিল। নতুন সরকারের অধীনে দীর্ঘদিনের সেই উদ্যোগ আবারও এগোতে শুরু করেছে।
পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির আওতায় দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটির আধুনিকায়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ)। ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ প্রকল্পটি অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির কাছ থেকে প্রথম নীতিগত অনুমোদন পায়। বৃহস্পতিবারের অনুমোদনটি মূলত ১৫ বছরের জন্য টার্মিনাল পরিচালনার খসড়া চুক্তি-সংক্রান্ত।
বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মালিকানাধীন চট্টগ্রাম ড্রাই ডক কোম্পানি লিমিটেড এনসিটি পরিচালনা করছে। টার্মিনালটিতে বছরে প্রায় ১৩ লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডেল করা হয়, যা চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪০ শতাংশ।
এনসিটি পরিচালনা নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারের আলোচনা কয়েক বছর ধরেই চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রক্রিয়াটি এগোলেও খসড়া চুক্তি পর্যালোচনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ড অতিরিক্ত সময় চাওয়ায় তা শেষ করা সম্ভব হয়নি। পরে বর্তমান সরকার আবার আলোচনা শুরু করে।
গত মে মাসে পিপিপি মডেলের আওতায় এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব মূল্যায়নের জন্য গঠিত কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেয় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। তখন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাব পর্যালোচনাধীন রয়েছে এবং অন্য কোনো প্রস্তাবের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। পরে আলোচনা কমিটিকে সহযোগিতার জন্য সিপিএ ১২ সদস্যের একটি সাপোর্ট টিম গঠন করে।
পিপিপি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রকল্পটির ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার হিসেবে আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশনকে (আইএফসি) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের যাচাই-বাছাই, চুক্তির কাঠামো ও প্রস্তাব আহ্বানের (আরএফপি) নথি প্রস্তুত, চুক্তিপত্র তৈরি এবং নির্বাচিত অপারেটরের সঙ্গে আলোচনায় আইএফসি পরামর্শকের ভূমিকা পালন করছে।
এনসিটিতেই বন্দরের বড় অংশের কনটেইনার হ্যান্ডেলিং
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এনসিটি বন্দরের সবচেয়ে বড় কনটেইনার টার্মিনাল। ২০২৫ সালে বন্দরের মোট কনটেইনারের প্রায় ৪৪ শতাংশ এই টার্মিনালের মাধ্যমে হ্যান্ডেল করা হয়েছে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে চারটি কনটেইনার টার্মিনাল চালু রয়েছে—এনসিটি, চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি)। প্রথম তিনটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। আর সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ২২ বছরের চুক্তির আওতায় পিসিটি পরিচালনা করছে।
এনসিটি ও ওসিওয়াই পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক অপারেটরের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।
এর আগে ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালসকে দীর্ঘমেয়াদি পিপিপি চুক্তির আওতায় লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে লালদিয়া ও এনসিটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এনসিটি বর্তমানে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু এবং এতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের দুই চিঠিতে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি
এনসিটি হস্তান্তরের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদনের দিনই নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দুটি পরস্পরবিরোধী চিঠি নিয়ে নতুন করে বিভ্রান্তি দেখা দেয়।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, একটি চিঠিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান ইজারা প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার অথবা তা বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে পাঠানো আরেকটি চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই দিনে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া দুই ধরনের নির্দেশনায় বন্দরসংশ্লিষ্টদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
তবে নতুন করে দেওয়া নীতিগত অনুমোদনের ফলে এনসিটি ও ওসিওয়াই পরিচালনার চুক্তি চূড়ান্ত করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এখনও চলমান রয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
চূড়ান্ত চুক্তিতে আন্তর্জাতিক অপারেটর কোন শর্তে এনসিটি ও ওসিওয়াই পরিচালনা করবে, তা নির্ধারণ করা হবে। এতে দুই পক্ষের আর্থিক ও পরিচালনাগত দায়িত্বের বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। চুক্তি কার্যকর করার আগে সরকারের আরও কিছু অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
