দেশের বেশিরভাগ মানুষের জন্ম তারিখ একাধিক। এমনকি কারো একেকটি দলিলে একেকটি জন্ম তারিখ। জন্ম নিবন্ধন সনদের ভিত্তিতে স্কুলে জন্ম তারিখ লেখার কথা হলেও এসএসসি পরীক্ষায় এখনো ‘হেডমাস্টারি’ জন্ম তারিখ বহুল প্রচলিত। এসএসসির আগে পরে জন্মনিবন্ধন সনদে বয়স পরিবর্তনের একটা হিড়িক চলতেই থাকে। ২০২৫ সালে মোট জন্মনিবন্ধন হয়েছিল ১০৩, ৪০, ২৭৬ জনের অথচ ঐ বছরে জন্মনিবন্ধন সনদ সংশোধিত হয়েছে ৭৯,১১,১১০ জনের (জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের ওয়েবসাইট)।
এত বিপুলসংখ্যক জন্মনিবন্ধন সনদ সংশোধিত হওয়ায় সনদটি প্রায় তামাশার বস্তুতে রূ পান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। জাতীয় পরিচয়পত্র হওয়ার কথা জন্মনিবন্ধন সনদের ভিত্তিতে। অথচ নাম, বাবা-মায়ের নাম ও জন্ম তারিখ এই দুই দলিলে সেটা ভিন্নতাও খুব একটা কম নয়। এরপর যদি বলি পাসপোর্ট সেটাও জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা জন্মনিবন্ধন সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার ঔচিত্য থাকলেও মাঝে মাঝে তাও আলাদা চোখে পড়ে। এটা বোধকরি এক ধরনের প্রবণতা এবং স্বয়ং জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবসও এই প্রবণতা হতে মুক্ত নয়। ২০০৭ হতে ২০১৬ পর্যন্ত ৩ জুলাই পালন করা ‘জন্মনিবন্ধন দিবস' ২০১৭ সাল হতে পালিত হতে শুরু করল ৬ অক্টোবরে।
২ জুলাই ১৮৭৩ সালে ব্রিটিশ সরকার অবিভক্ত বাংলায় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন জারি করে। আইনটির যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় দীর্ঘ ১৩১ বছরে মাত্র ৮ শতাংশ মানুষের জন্মনিবন্ধন করা হয়, যা ছিল হতাশাজনক। ফলে ২০০৪ সালের ৭ ডিসেম্বর শতাব্দী প্রাচীন আইনটি বাতিল করে নতুন করে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন, ২০০৪ জারি হয়। নতুন আইনটিতে স্থানীয় সরকার বিভাগকে কর্তৃত্ব দেওয়া হয় এবং ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশনের চেয়ারম্যান/ মেয়র, ক্যান্টনমেন্ট এক্সিকিউটিভ অফিসার ও বিদেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতগণকে নিবন্ধক করা হয়। জারিকৃত আইনটি ২০০৬ সালের ৩ জুলাই কার্যকর হওয়ায় পরবর্তী বছর হতে প্রতি বছরের ৩ জুলাই জাতীয় পর্যায়ে জন্মনিবন্ধন দিবস হিসেবে পালন করা হয়। তারিখটির সঙ্গে দেশে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইনটি কার্যকর হওয়ার দিনক্ষণের একটি যোগসূত্র ছিল। ২০০১ সাল হতে ইউনিসেফের সহায়তায় পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৭ হতে প্রকল্পটি সারা দেশে বিস্তৃত হয়। ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর হতে প্রকল্পের পরিবর্তে রাজস্ব খাতে রেজিস্ট্রার জেনারেল জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন অফিস প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন কর্তৃপক্ষ জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবসটি রেজিস্ট্রার জেনারেল অফিস প্রতিষ্ঠার সঙ্গে স্মরণীয় করে রাখার প্রস্তাব দিলে ২০১৭ সালে সরকার বিশ্ব শিশু সপ্তাহের পরদিন ৬ অক্টোবরকে জাতীয় পর্যায়ে জন্মনিবন্ধন দিবস ঘোষণা করে। জন্মনিবন্ধন দিবস পরিবর্তন করতে চাওয়ার পিছনে যুক্তি ছিল, জুলাই মাসে গরম ও বৃষ্টি । তাছাড়া অর্থ বৎসরের একেবারে শুরুতে বিধায় দিবস পালনের আর্থিক মঞ্জুরি পেতে অসুবিধা হয়। তাই সুবিধাজনক তারিখে দিবস পালনের প্রস্তাব। অন্তর্নিহিত কারণ ছিল ৩ জুলাই বললেই কার্যকরণ হিসেবে ২০০৬ সাল আসে আর তাতে দেশে জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম চালু করার ক্রেডিট অন্যদের কোর্টে চলে যায়। ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস, জুলাইয়ের প্রথম শনিবার আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস, ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালনের ক্ষেত্রে গরম, বৃষ্টি ও অর্থবৎসরের শুরু প্রতিবন্ধক না
হলেও জন্মনিবন্ধন দিবস পালন করতেই গরম, বৃষ্টি ও অর্থবছরের শুরু প্রতিবন্ধক হয়ে যায়!
দেশে বিপুল উৎসাহে ২০০৬ সাল হতে জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এক-এগারোর সরকার ২০০৭ সালে জনদাবির পরিপ্রেক্ষিতে ছবিযুক্ত ভোটার আইডি কার্ড তৈরি করার উদ্যোগ নেয়। ভোটার আইডি কার্ডে জন্মনিবন্ধন সনদের অনুরূপ ১৭ অঙ্কের সংখ্যা ব্যবহার করা হয়েছিল । ১৭ অঙ্কের প্রথম চার অঙ্ক জন্মসাল, পরের ৭ অঙ্ক ভৌগোলিক পরিচিতি ও শেষ ৬ অঙ্ক ছিল ধারাবাহিক নম্বর । ভোটার আইডি কার্ড হিসেবে তৈরি হওয়ায় কার্ডটি নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থাপনায় চালু হয়। দেশে অবস্থিত প্রাপ্ত বয়স্ক প্রায় সকল নাগরিক ভোটার আইডি কার্ড ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় কার্ডটিকে জাতীয় পরিচয়পত্রে পরিবর্তিত করা হয়। ভোটার আইডি কার্ডের মালিকানার সূত্র ধরে জাতীয় পরিচয়পত্র নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারেই থেকে যায়। পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশন দৈবচয়নভিত্তিক ১০ অঙ্কের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর প্রবর্তন করে । জন্মনিবন্ধন সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ব্যবহারের ক্ষেত্রসমূহ প্রায় একই। সেখানে একই কাজের জন্য মানুষ দুটো ভিন্ন কার্ড ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে । কখনো কখনো কেউ কেউ সুযোগের অপব্যবহার করছে ।
ওয়ার্ল্ডমিটারের তথ্য অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৮৩ লাখের অধিক । চ্যাট জিপিটি বলছে, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মোট জন্মনিবন্ধন হয়েছে প্রায় ২১ কোটি ১১ লাখ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এ সংখ্যাটি ক্রমপুঞ্জিত এবং মৃত ব্যক্তিদের অনেকের মৃত্যুনিবন্ধন না হওয়ায় সংখ্যাটি প্রচলিত ধারণার জনসংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি । সে ব্যাখ্যা মেনে নিলেও অনেক মানুষের একাধিক জন্মনিবন্ধনের ঘটনাকে একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
একাধিক জন্মনিবন্ধন হওয়ার জানতে পারা কারণগুলো হলো : (১) বেশি বয়সে পছন্দের স্কুলের নিচের ক্লাসে ভর্তি হওয়ার জন্য নতুন জন্মনিবন্ধন; (২) এসএসসি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশনের সময় বয়স কমানো/ বাড়ানো; (৩) বাল্যবিবাহের অভিযোগ এড়াতে বয়স বৃদ্ধি; (৪) পাসপোর্টের তথ্য পরিবর্তনের জন্য; (৫) শিক্ষাগত যোগ্যতাবিহীন পদে চাকরির আবেদনে বয়স হ্রাস, এ ধরনের নানা কারণেই নতুন করে জন্মনিবন্ধন করে থাকে। স্থায়ী ঠিকানা, বর্তমান ঠিকানা ও জন্মস্থান এই তিন ঠাঁইয়ের যে কোনো জায়গায় জন্মনিবন্ধন করার সুযোগ থাকায় যারা একাধিক নিবন্ধনের শুলুক সন্ধানে থাকেন তারা সহজেই কাজ হাসিল করতে পারেন।
একই মানুষের পরিচয়ের জন্য একটি জন্মনিবন্ধন সনদ ও একটি জাতীয় পরিচয়পত্র এই দুটি পৃথক দলিল থাকার কোনো দরকার নাই। দুই সরকারের আমলে দুই দাতাগোষ্ঠীর অর্থায়নে হওয়ায় আলাদা প্রকল্প ও দুটি পৃথক দলিল হয়েছে । অথচ একটি দলিলের মাধ্যমেই এই দুই দলিলের চাহিদা মেটানো সম্ভব। রাষ্ট্র চাইলে এখনো তা করা সম্ভব। দেশে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা ব্লক পর্যায়ে প্রতিটি বাড়ি ভিজিটকালে তাদের জনগণের দায়িত্বের অংশ হিসেবে জন্ম ও মৃত্যুর সংখ্যা সংগ্রহ করে থাকেন। একই হাতে জন্ম তথ্য ও সনদ অনুমোদনের ক্ষমতা থাকায় বাড়তি জন্মনিবন্ধন ঘটার সুযোগ থাকে। সে সুযোগকে হ্রাস করতে জন্ম-মৃত্যু তথ্য সংগ্রহ/ প্রদান ও সনদ দুটি আলাদা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হতে পারে। জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র অবিলম্বে একীভূত করে যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র আছে তাদের জন্মনিবন্ধন সনদ অকার্যকর ঘোষণা করা যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে একজন জাতীয় পরিচয়পত্রধারীর জন্মনিবন্ধন সনদ কেবলমাত্র তার মৃত্যু নিবন্ধনের জন্য ছাড়া ব্যবহারের সুযোগ নাই। সরকারকে প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে জন্মনিবন্ধন তথা জাতীয় পরিচয়পত্র কোন প্রতিষ্ঠানের আওতায় থাকবে। আলোচনার সুবিধার্থে বর্তমান নিবন্ধে জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধন তথা জাতীয় পরিচয়পত্র প্রতিষ্ঠান (জনিজাপপ্র) নামটি ব্যবহার করছি।
নতুন বন্দোবস্তে জন্ম ও মৃত্যু হাসপাতালে হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অন্যথায় পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা জনিজাপপ্র-র নিকট জন্ম ও মৃত্যু তথ্য প্রেরণ করবেন। বিদেশে সংশ্লিষ্ট দেশের হাসপাতালের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দূতাবাস জনিজাপপ্রকে তথ্য প্রেরণ করবে। জন্ম ও মৃত্যুস্থান ব্যতীত অন্য কোনো স্থানের কেউ তথ্য পাঠাতে পারবেন না। শিশুর প্রথম ডোজ ইপিআই টিকার আগেই জন্ম নিবন্ধন সম্পন্ন করানো পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকার কর্তব্য বলে গণ্য হবে।
ব্যক্তির পরিচিতি নম্বর শুরু হবে জন্মসাল মাস ও দিনের ৮ অঙ্ক দিয়ে। এরপর প্রতিদিনের ৫ অঙ্কের ধারাবাহিক নম্বর। দেশে বর্তমানে প্রতিদিন আনুমানিক ৯,৪০০-৯,৫০০টি শিশু জন্ম নেয়। ফলে দৈনিক ধারাবাহিক সংখ্যাটি ৫ অঙ্কের করা নিরাপদ, তাতে কোনো শিশুরই বাদ পড়ার আশঙ্কা থাকবে না।
অতীত অভিজ্ঞতা হতে এটি স্পষ্ট যে, নতুন করে সকলকে ব্যক্তিগত কার্ড দিতে গেলে আবারও হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। তাই যেখানে যে অবস্থায় আছে সে অবস্থায় রেখে নতুন বন্দোবস্তে কেবলমাত্র নবজাত শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করে ব্যক্তিগত কার্ড চালু করলে চার দশকের মধ্যেই সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে । ব্যক্তির কাছে চার পাঁচ দশক দীর্ঘ সময় হলেও রাষ্ট্রের কাছে তা খুবই ক্ষুদ্র । তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুন্দর জীবন দিতে শুরু হোক নতুন বন্দোবস্তে ব্যক্তিগত পরিচিতি কার্ড।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব ও সাবেক প্রকল্প পরিচালক, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন প্রকল্প
