নীল জলরাশির অবাক সৌন্দর্য

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৮:০৯

 

নীল জলরাশির কাপ্তাই লেক, স্বচ্ছ নীলাভ জল আর বিস্তৃত মুগ্ধতা। সবুজ বৃক্ষ শোভিত উঁচু-নিচু পাহাড়। গভীর মমতা আর ভালোবাসায় গড়া উপজাতীদের বর্ণিল জীবনধারা, অপূর্ব সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মিলিত আহ্বান।—এমন সব সৌন্দর্য এক জায়গায় মিলিত হয়েছে দেশের যে স্থানটিতে তার নাম কাপ্তাই। প্রকৃতির প্রায় সব রূপ-রঙ যেন এখানে এসে মিশেছে একই সমান্তরালে।

রাঙামাটির বেশিরভাগ জায়গাজুড়ে এই কাপ্তাই লেক। আমরা অনেকে কাপ্তাই লেকের একদিনের ট্রিপে যাই। আমি তাদেরকে বলবো, আপনি কাপ্তাই লেকের ক্ষুদ্র অংশও দেখেননি! শুভলং ঝরনা কিংবা ঝুলন্ত ব্রিজ পর্যন্ত ঘুরে কাপ্তাইয়ের সৌন্দর্যের বর্ণনা করা অসম্ভব। ছোট হরিণা পর্যন্ত ছিল আমার এবারের যাত্রাপথ!

রাঙামাটির বাস যখন রিজার্ভ বাজার পৌঁছায় তখন ভোর। পুরো রাঙামাটি কুয়াশায় আচ্ছন্ন ছিল। লংগদুর প্রথম লঞ্চ ছাড়ে ৭টা ৩০ মিনিটে। ঘাটে গিয়ে জানতে পারলাম সেদিন শুভলং হাটবার, তাই সরাসরি লংগদু না গিয়ে উঠে গেলাম জুরাছড়ির লঞ্চে। সব লঞ্চ শুভলং বাজার হয়ে যায় তাই যেকোনো একটা লঞ্চে উঠলেই শুভলং বাজারে নামতে পারবেন।

শুভলং বাজারের পাশে রঙরাঙ পাহাড়। রূপের রানি রঙরাঙ, প্রকৃতির দৃঢ়তা আর রূঢ়তার মাঝেও যে অপার সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, এ যেন তারই প্রমাণ দিয়ে চলছে অবিরাম। প্রকৃতির দু-হাত ভরে উজাড় করে দেওয়া সেই রূপ নিজের চোখে না দেখলে হয়তো বিশ্বাস হওয়ার নয়। রাঙ্গামাটির কাপ্তাই লেকের বালুখালীতে ঘোরাঘুরি করার কোনো এক ফাঁকে দেখা করতে পারেন রঙরাঙের সঙ্গে। অদূরের সেই পাহাড়ের ওপর চোখ পড়তেই বদলে যাবে মনের সব অনুভূতি, ক্লান্তি-জরার কালো মেঘ সরে গিয়ে ভেসে উঠবে রংধনুর সাত রঙ।

ক্যাম্পঘাট থেকেই সিঁড়ি উঠে গেছে, হেঁটেই চূড়ায় চলে যাওয়া যায়। চূড়ায় উঠে পেছনের দিকে গিয়ে কিছুটা অবাক হলাম! বহুকাল ধরে এই জায়গার একটা ছবি নেটে ঘুরে-ফিরে সামনে আসতো, কিন্তু কোনো তথ্য পাইনি! এই পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা কাপ্তাই লেকের দৃশ্য অসাধারণ। দু-পাশে খাঁড়া পাহাড়ের ওপর থেকে দেখলে নৌকাগুলো পিঁপড়ার মতো মনে হয়। পানির রঙটাও একদম ঝকঝকে। ওপর থেকে সমস্ত শুভলং বাজার আর তার সামনে বিশাল কাপ্তাই লেক সুন্দর কিছু দৃশ্যের তালিকায় থাকবে।

পাহাড় থেকে নেমে শুভলং বাজার ঘুরে দেখতে অনেক সময় চলে যায়। সাড়ে ১১টার দিকে মারিশ্যাগামী, পরের লঞ্চে উঠে গেলাম কাট্টলী বাজারের উদ্দেশ্যে।

লেকের মাঝে ছোট্ট এক দ্বীপ কাট্টলী বাজার। চারদিকে পানি আর পানি, দূরে কয়েকটি পাহাড়। বাজারে ঢুকতেই নাকে আসবে শুঁটকির গন্ধ। অন্যপাশে একটা মসজিদ আর ট্রলারের ঘাট সাথে বেশকিছু দোকান। দ্বীপের মানুষের মুখে আফসোস, কাট্টলীর আগের সেই জৌলুস নাকি নেই। জুম্মার নামাজ পড়ে আড়াইটার দিকে মাইনীমুখগামী লঞ্চে উঠে পড়ি। লংগদু পৌঁছাতে বিকেল ৫টা বেজে গেল। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত লঞ্চেই কেটেছে। চা-বিস্কুট, কেক আর কলা খেয়েই পার করেছি এতটা সময়।

রিজার্ভ বাজার থেকে লংগদু আসতে একেক জায়গার দৃশ্য একেকরকম। কখনো পাহাড়ের কোলঘেঁষে আবার কখনো পাহাড়গুলোকে অনেকদূরে ফেলে। লংগদু পৌঁছে থাকার বোর্ডিং না পাওয়ায় চলে গেলাম মাইনীমুখ বাজার। নতুন আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তাটা শেষ বিকেলে প্রাণ জুড়িয়ে দেয়। আলোয় আলোকিত কাপ্তাই লেকের বুকে দাঁড়ানো মাইনীমুখ আর্মি ক্যাম্পের নতুন পার্ক। এত আলোর মাঝেও অন্ধকার কাপ্তাই লেকের ছোট ছোট ডিঙি নৌকার হ্যাজাক লাইটগুলোই বেশি টানে।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে পাহাড়িকা বোর্ডিং-এর খোলা ছাদে বের হতেই চোখে পড়ল মেঘ কুয়াশায় ঢাকা কাপ্তাই লেক। হালকা নাশতা করে উঠে পড়লাম সকাল সাড়ে ৭টার বিরতিহীন লঞ্চে, পথে থামবে শুধু লংগদু আর শুভলং ক্যাম্পঘাটে। তবে লঞ্চে ওঠার আরো অনেক উপায় আছে, অনেকেই নৌকা নিয়ে লেকের মাঝখানে লঞ্চের আশায় বসে থাকেন, লঞ্চ একটু স্লো করলেই উঠে যান। আবার অনেকে লেকের মাঝে নেমেও গেল। কিছুটা এয়ারপোর্ট থেকে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফেরার মতো। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে লঞ্চ এগিয়ে চলে শুভলং বাজারের দিকে।

কিছুক্ষণের মধ্যে নেমেও গেলাম শুভলং বাজার। আমাদের রেখে লঞ্চ চলে গেল রাঙামাটি, আর আমার উদ্দেশ্য বর্ডারের কাছের বাজার ছোট হরিণাতে। ঝকঝকে আকাশ কাঠের লঞ্চের ছাদে চামড়া পোড়ানো রোদ, যেতে মন চায় না শুভলং বাজার ছেড়ে। লঞ্চ এগিয়ে চলে বরকলের দিকে। দু-দিকে পাহাড়ের উচ্চতা বাড়তে থাকে আর জানান দিতে থাকে বরকল খুব বেশিদূরে নয়। ২০ মিনিটের যাত্রা বিরতিতে বরকল বাজারে দুপুরের খাবার সেরে নিই। বরকলের চারপাশটা আমার কাছে অনেক ভালো লাগলো। শুধু বরকল দেখার জন্যই এখানে আসা যায়!

বরকল বাজার ছেড়ে আঁকাবাঁকা কর্ণফুলীর ওপরের দিকে চলছে আমাদের লঞ্চ। পাহাড়ের কোলে ছবির চেয়েও সুন্দর গাছে ঢাকা ছোট ছোট ঘরবাড়ি। তবে ততটা সুন্দর না তাদের জীবনযাত্রা। কলাবুনিয়া, মাইপলেন, এরাবুনিয়া, ভূষনছড়া বাজারে মালপত্র নামাতে নামাতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায় ছোট হরিণা বাজারে পৌঁছাতে। সেখানে নেমে আর্মি ক্যাম্পে এন্ট্রি করার সময় তাদের বেশ অবাকই মনে হলো যে, এখানে ঘুরতে এসেছি কিংবা আমাদের উত্তর সন্তোষজনক ছিল না। কিছুটা তিক্ত অভিজ্ঞতা কিছুটা মিষ্টি ছোট হরিণা মনে থাকবে মানুষের মাঝে এর অজানা রহস্যের কারণে। অথবা রাতের বেলার কর্ণফুলীতে নেমে ডুবে থাকার কারণে।

সন্ধ্যা হতেই দোকান-পাট প্রায় বন্ধ, তাই ৭টার মধ্যে রাতের খাবার সেরে নিই। খাওয়া শেষে আর্মি ক্যাম্পের ঘাটে বসে টিভি দেখা আর কর্ণফুলীর উজানে নৌকার আলো দেখেই সময় কাটানো। আর সামনে গেলে পাবেন বড় হরিণা বাজার, তারও সামনে গেলে থেগামুখ। যেখানে কর্ণফুলী নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ছোট হরিণার পর সামনে যেতে লাগবে লিখিত অনুমতি। সেটাতো আমার কাছে নেই!