আকাশের কাছ থেকে একমুঠো নীল নিয়ে হ্রদ নিজেও ধারণ করেছে বর্ণিল রঙ। পাহাড়ের চূড়ায় নীলজলের আস্তর আকাশের সাথে মিশে তৈরি করেছে এক প্রাকৃতিক কোলাজ। মুগ্ধ নয়নে দেখতে হয় আকাশ, পাহাড় আর জলের মিতালী। প্রকৃতি এখানে ঢেলে দিয়েছে একরাশ সবুজের ছোঁয়া। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে আসার ক্লান্তি হারিয়ে যায় বগা লেকের অতল গহ্বরে।
এ যেন সুন্দরের লীলাভূমি। বগা লেককে অনেকে ড্রাগন লেকও বলে থাকে। সকাল, সন্ধ্যা, রাত—তিন বেলায় বগা লেক নতুনরূপে ধরা দেয়। সকালের উজ্জ্বল আলো যেমন বগা লেককে দেয় স্নিগ্ধ সতেজ রূপ। ঠিক তেমনি রাতের বেলায় দেখা যায় ভিন্ন এক মায়াবী হাতছানি। রাতের বগা লেক দিনের চেয়ে একেবারেই আলাদা। যদি রাতটি হয় পূর্ণিমার, তবে এটি হতে পারে আপনার জীবনের সেরা রাতের একটি। কী অসাধারণ সেই রূপ! নিকষকালো অন্ধকার রাতে পাহাড়ের বুক চিরে হঠাত্ একফালি চাঁদ মৃদু আলোর ঝলক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বগা লেকের শান্ত জলে।
শান্ত জলের অপরূপ দৃশ্য দেখতে খানিকটা ভয়ঙ্কর পথ পাড়ি দিতে হবে আপনাকে!
ভয়ঙ্কর পথ! বড় বড় পাহাড় ধসে রাস্তা হারিয়ে গেছে, আর আমরা এভাবে বেয়ে পথ চলছি। ঠিক যেন টিকটিকির মতো! কোথাও কোথাও কোমর পর্যন্ত কাঁদা। সবার পেছনে ক্যামেরা হাতে ছবি তুলতে তুলতে আমিও ফেঁসে গেলাম! কাঁদায় দেবে গেল হাঁটুর ওপর পর্যন্ত। ডিসকভারির বাংলা ধারাভাষ্যের মতো আপদকালীন কর্মীর খোঁজ করছিলাম তখন! তবে শীতকালে এই রাস্তা অনেকটা নিরাপদ। একটু সচেতন হলেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে পথচলা যায়।
অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়দের বান্দরবান অ্যাডভেঞ্চার শুরু হয় মূলত বগা লেক দিয়ে। বগা লেকে রাত্রিযাপন করেনি এমন অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পাওয়া দুষ্কর। দেশের হিমালয় জয়ী সকল পর্বতারোহী বগা লেক দিয়ে তাদের পর্বতারোহণ শুরু করেছিল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মিথ ও অসাধারণ থাকার জায়গা এখানকার মূল আকর্ষণ। দুর্গম এ অঞ্চলে যেতে হলে পথচলার কষ্ট সহ্য করার মতো মন-মানসিকতা থাকতে হবে। বিশেষ করে রুমা থেকে বগা লেক যাওয়ার পথটি এবড়ো থেবড়ো, যথেষ্ট ওঠানামার পথ। আর গাড়িতে চলার সময় পাবেন ধুলা। তবে এ পথচলায় যে অ্যাডভেঞ্চার আছে তা দেশের আর কোথাও পাবেন না!
বগা লেক বান্দরবান শহর থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বান্দরবান শহর হয়ে প্রথমে রুমা বাজার যেতে হবে। বান্দরবান থেকে রুমা বাজারের দূরত্ব ৪৮ কিলোমিটার। লোকাল বাস কিংবা চাঁন্দের গাড়ি/জিপে করে রুমা বাজার যাওয়া যায়। বাসে যেতে হলে বান্দরবানের রুমা বাসস্ট্যান্ডে যেতে হবে। সেখান থেকে ১ ঘণ্টা পর পর বাস রুমার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। দলগতভাবে গেলে রুমা বাজার যেতে পারেন জিপ/চাঁন্দের গাড়িতে। এক গাড়িতে ১৩ জন যাওয়া যায়।
রুমা বাজার পৌঁছে বগালেক যাওয়ার জন্য প্রথমে গাইড ঠিক করে নিতে হয়। অনুমোদিত যেকোনো গাইডকে নেওয়া যায়। রওনা হওয়ার আগে রুমা বাজার আর্মি ক্যাম্প থেকে বগা লেক যাওয়ার অনুমতি নিতে হবে। অনুমতির জন্য ভ্রমণকারী সকল সদস্যের পরিচয় লিখিত কাগজে জমা দিতে হয়। এই কাজগুলো করতে গাইড সাহায্য করে থাকে। বিকেল ৪টার পর বগালেক যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না।
রুমা বাজার থেকে বগা লেকের আগমুহূর্তে কমলা বাজার পর্যন্ত যেতে পারবেন। কমলা বাজার নেমে বাগা লেক যেতে একটা পাহাড় উঠতে হবে। প্রায় ২৫ মিনিট পায়ে হেঁটে পাহাড়ে ওঠার পরই আপনি বগা লেকের দেখা পাবেন। বগা লেক পৌঁছে সেখানের আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে হবে।
বগা লেকের ধারে যখন প্রবেশ করবেন তখন শরীর ও মনের প্রশান্তির পরশ চলে আসবে। মনে হবে এটা আরেক স্বর্গ! যারা সাঁতার জানেন না তারা ভুলেও বগা লেকে নামবেন না। বগা লেকের কাছাকাছি বম ও খুমি সম্প্রদায় বসবাস করেন। তাদের যে কাউকে গাইড হিসেবে যদি নেন তাহলে বগা লেকসহ আশেপাশের সব দর্শনীয় স্থান তারা আপনাকে ঘুরে দেখাবে। বগা লেকের চারপাশে যেসব গাছ রয়েছে সেখানে নাম না জানা শতাধিক প্রজাতির পাখি দেখতে পাবেন। এছাড়া এই দুর্গম অঞ্চলে ছোট আকারের হরিণ, বন বিড়াল, বড় আকারের বেজি, বিষাক্ত সাপ দেখতে পাবেন।
বগালেকে উন্নমানের কোনো হোটেল বা রিসোর্ট নেই। আদিবাসীদের ছোট ছোট কিছু কটেজ আছে। সেসব কটেজেই থাকতে হয়। প্রাকৃতিক পরিবেশে আদিবাসীদের এই কটেজগুলোতে থাকতে জনপ্রতি খরচ হয় ১৫০ টাকা।
বগা লেকের পথে যেতে যেতে আদিবাসী সমাজের সংগ্রামী জীবনের অংশ বিশেষ দেখতে পাবেন। কিভাবে তারা প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে সমাজে বেঁচে আছেন তা চাক্ষুস দেখার সুযোগ পেয়ে যাবেন। যদি তাদের সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ পান দেখবেন তাদের ভেতর কোনো জড়তা নেই, খুব সহজেই আপনাকে তারা আপন করে নেবে।
