সেদিন মৃত্যুর মুখে পড়েও ফিরে এসেছিলেন অমিতাভ, কীভাবে নবজন্ম হয় বিগ বি-র?

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:০৫

বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের ৮৪তম জন্মদিন আজ। ১৯৪২ সালের ১১ অক্টোবরে ভারতের প্রয়াগরাজে জন্ম নেওয়া অভিনেতা দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে হিন্দি চলচ্চিত্রে কাজ করছেন। কবি হরিবংশ রাই বচ্চন ও তেজি বচ্চনের ছেলে হিসেবে বেড়ে ওঠা এই অভিনেতার জীবনের শুরুটা অবশ্য আজকের তারকাসুলভ জৌলুশে মোড়া ছিল না। 

লম্বা গড়ন ও ভারী কণ্ঠস্বরের কারণে চলচ্চিত্রজগতে শুরুর দিকে তাকে নিয়ে সংশয় ছিল। সেই কণ্ঠস্বরই পরে হয়ে ওঠে তার অন্যতম পরিচয়। আর যে চেহারা একসময় প্রচলিত নায়কের ছাঁচে ঠিকমতো খাপ খেত না, সেটিই একসময় ভারতীয় মধ্যবিত্তের ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

‘কুলি’র সেটে প্রায় মৃত্যুর মুখে চলে গিয়েছিলেন। একসময় ঋণের বোঝা, মামলা আর কাজ না পাওয়ার হতাশায় ডুবেছিলেন। রাজনৈতিক বিতর্কেও জড়িয়েছিল তার নাম। তবু প্রতিবারই ফিরে এসেছেন অমিতাভ বচ্চন। 

১৯৮২ সালের ২৬ জুলাইয়ে বেঙ্গালুরুতে মনমোহন দেশাইয়ের ‘কুলি’ সিনেমার শুটিং চলছিল। সহ-অভিনেতা পুনীত ইসারের সঙ্গে একটি মারপিটের দৃশ্য করতে গিয়ে গুরুতর আহত হন অমিতাভ। দৃশ্য অনুযায়ী, লাফ দিয়ে একটি টেবিলের ওপর পড়ার কথা ছিল তার। কিন্তু সময়ের সামান্য এদিক-ওদিক তাকে টেবিলের কোণে আঘাত পেতে বাধ্য করে। আঘাত লাগে পেটে, ক্ষতিগ্রস্ত হয় অন্ত্র।

শুরুতে ঘটনাটি শুটিংয়ের সাধারণ দুর্ঘটনা বলে মনে হলেও দ্রুত পরিষ্কার হয়ে যায়, পরিস্থিতি ভয়াবহ। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসা চলে। একাধিক অস্ত্রোপচার করতে হয়। চিকিৎসকেরা তার জীবন বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। ভারতজুড়ে ভক্তদের উদ্বেগ আর প্রার্থনার কেন্দ্র হয়ে ওঠেন তিনি।

এই দুর্ঘটনা শুধু একজন অভিনেতার জীবনকেই ওলটপালট করেনি, বদলে দিয়েছিল ‘কুলি’ সিনেমার ভাগ্যও। পরিচালকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছবির শেষ দিকে অমিতাভের চরিত্রের মৃত্যুর কথা ছিল। কিন্তু বাস্তব জীবনে তাকে হারানোর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন দর্শকেরা পর্দায়ও তার মৃত্যু মেনে নিতে পারবেন না—এমন ভাবনা থেকে বদলে দেওয়া হয় ছবির সমাপ্তি। ১৯৮৩ সালে মুক্তির পর ‘কুলি’ হয়ে ওঠে বছরের অন্যতম বড় ব্যবসাসফল সিনেমা।

জানা যায়, এই দুর্ঘটনার শারীরিক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। ২০১৭ সালে হেপাটাইটিস-বি সচেতনতা কার্যক্রমে অমিতাভ জানিয়েছিলেন, দুর্ঘটনার পর রক্তসঞ্চালনের সময় সংক্রমিত রক্তের মাধ্যমে তার শরীরে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস প্রবেশ করে। বহু বছর পর, ২০০০ সালে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় বিষয়টি ধরা পড়ে। তখন তিনি জানান, তার যকৃতের প্রায় ৭৫ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

অমিতাভের জীবনে বিতর্কের আরেকটি বড় অধ্যায় রাজনীতি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল দীর্ঘদিনের। ১৯৮৪ সালে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে এলাহাবাদ আসন থেকে কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন তিনি এবং জয়ী হন। কিন্তু সংসদীয় রাজনীতিতে তার পথ দীর্ঘ হয়নি। ১৯৮৭ সালে সংসদ সদস্যের পদ ছেড়ে দেন।

এরপর বফর্স কামান কেনাকাটা নিয়ে দুর্নীতির বিতর্কে অমিতাভ ও তার পরিবারের নাম জড়িয়ে পড়ে। রাজীব গান্ধীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ায় বিষয়টি আরও আলোচিত হয়। অভিযোগের কারণে তাকে জনসমক্ষে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। তবে অভিযোগ আর প্রমাণ এক নয়—এ কথা মনে রাখা জরুরি।

যখন চলচ্চিত্রে নিয়মিত কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছিল, তখনই আসে টেলিভিশনে কাজের প্রস্তাব। ২০০০ সালে ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’ সঞ্চালনার দায়িত্ব নেন অমিতাভ। সেই সময় অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, বড় পর্দার সুপারস্টার ছোট পর্দায় এলে তার তারকাখ্যাতি ক্ষুণ্ন হতে পারে। তার স্ত্রী জয়া বচ্চনও প্রথম দিকে সিদ্ধান্তটি নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন বলে পরে জানিয়েছেন।

তবে ঝুঁকি নিয়েছিলেন অমিতাভ। আর সেই ঝুঁকিই হয়ে ওঠে তার পুনর্জন্মের অন্যতম সোপান। প্রতিযোগীদের সঙ্গে সহজ কথোপকথন, সংযত রসবোধ, আন্তরিকতা এবং পর্দার বাইরের মানুষ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার ক্ষমতা তাঁকে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও জনপ্রিয় করে তোলে। একসময় যাঁকে শুধু সিনেমার পর্দায় দেখা যেত, তিনি হয়ে ওঠেন ঘরের পরিচিত মুখ।

১৯৬৯ সালে চলচ্চিত্রে অভিষেকের পর ‘জঞ্জির’, ‘দেওয়ার’, ‘শোলে’, ‘ডন’সহ অসংখ্য সিনেমায় অভিনয় করে ভারতীয় চলচ্চিত্রে নিজের স্থায়ী অবস্থান তৈরি করেন অমিতাভ বচ্চন। তার শক্তিশালী অভিনয়ের কারণে একসময় তিনি ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’ নামে পরিচিতি পান। 

পরবর্তীতে ‘বাগবান’ (২০০৩), ‘ব্ল্যাক’ (২০০৫), ‘সরকার’ (২০০৫), ‘চিনি কম’ (২০০৭), ‘পা’ (২০০৯) ও ‘পিকু’–এর (২০১৫) মতো ছবিতে তিনি নিজের অভিনয়ের নতুন দিক তুলে ধরেন। শুধু অ্যাকশন নায়ক নয়, বয়সের সঙ্গে মানানসই জটিল চরিত্রেও যে তিনি সমান শক্তিশালী, তা প্রমাণ করেন।

 

 

ইত্তেফাক/এনটিএম