প্রশাসনের কাছ থেকে যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়ার অভিযোগ তুলে রংপুরে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রংপুর-৩ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান। প্রয়োজনে থানা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। তার বক্তব্যের একটি ভিডিও ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমাকে বাধ্য করবেন না থানা ঘেরাওয়ের জন্য, আমাকে বাধ্য করবেন না ডিসি অফিস ঘেরাওয়ের জন্য। পরিষ্কার বললাম। আমি ভদ্র লোক, কিন্তু অভদ্র হতে বাধ্য করবেন না।’
সভায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘আপনারা এমপিকে পাত্তা দিচ্ছেন না? হোয়াই? হোয়াই? কী মনে করেন, আমরা আসমান থেকে আসছি? মঙ্গল গ্রহ থেকে আসছি? উই আর দ্য সন অব দিস সয়েল, অব দিস ল্যান্ড। জনগণ আমাকে ভোট দিয়েছে। আপনারা পাত্তা দিচ্ছেন না কেন? চেয়ার দিতে চান না কেন? জনগণ নিয়ে কি ঘেরাও করব? রাস্তাঘাট চলাচল বন্ধ করে দেব?’
সভায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে পদমর্যাদাক্রম অনুসরণ না করা, সরকারি বিভিন্ন কমিটিতে সংসদ সদস্যদের প্রতিনিধি না রাখা, সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম এবং একটি দলের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ তোলেন মাহবুবুর রহমান।
প্রশাসনের লোকজনকে উদ্দেশ করে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘যদি পাবলিক খেপে যায়, তাহলে কিন্তু সেই খ্যাপানো আপনারা থামাতে পারবেন না, পরিষ্কার বলে দিলাম। সেই ক্ষমতা পুলিশের নাই, কারও নাই। পাবলিক অত বোকা আর নাই। পুলিশকে, র্যাবকে আর ভয় পায় না, তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য।’
সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি অভিযোগ করেন, একটি দলের লোকজনকে প্রাধান্য দিয়ে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘সব ডিলার একটা দল থেকে দেওয়া হয়েছে। যদি তা–ই হয়, তাহলে আপনারা অন্যদেরকে এখানে আবেদন করালেন কেন? প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হলো কেন?’
সংসদ সদস্য অভিযোগ করেন, এমনও হয়েছে, একই পরিবারের তিনজন সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন। মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এ রকম ঘটনা ইতিপূর্বে ঘটছে বলে আমি মনে করি না। এটা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ জনগণের মধ্যে আছে। এই অসন্তোষ কত দূর পর্যন্ত যাবে, আমি জানি না। আমি জনপ্রতিনিধি হিসেবে জনগণের কাছে এর জবাবদিহি দিতে পারতেছি না। জবাবটা কী হবে, মাননীয় ডিসি ঠিক করে দিলে ভালো হয়।’
জেলার বিভিন্ন সরকারি কমিটিতে সংসদ সদস্যদের প্রতিনিধি না রাখার বিষয়টিও তুলে ধরেন মাহবুবুর রহমান। তার অভিযোগ, এসব কমিটি একটি দলের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের মতামত যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জেলায় অনেক কমিটি আছে, কিন্তু এমপির কতজন প্রতিনিধি সেখানে আছেন। স্পষ্ট বলা আছে, এমপির প্রতিনিধি থাকতে হবে, সেখানেও নাই। সমস্ত একটা দল তাদের কুক্ষিগত করে নিয়েছে। এটা কি গণতন্ত্র? এর মাধ্যমে কি জনগণের মতামত প্রতিফলিত হবে?’
সভায় রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের অনুপস্থিতি নিয়েও আপত্তি জানান এই সংসদ সদস্য। সিটি করপোরেশন-সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিত না থাকার কারণ জানতে চান তিনি। ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই সংসদ সদস্য বলেন, ‘সিটি নিয়ে আলোচনা হবে; সিটি প্রশাসক নাই, মেয়র নাই, এ তো হতে পারে না! তারা আসবেন না কেন, আমার মাথায় ঢোকে না। এমপিরা যদি থাকতে পারেন, হোয়াই নট প্রশাসক? হোয়াই নট মেয়র? আমি বুঝি না। হোয়াই নট পুলিশ কমিশনার? তাহলে কী তারা আমাদের চেয়েও সুপেরিওর। রুল অব প্রিসিডেন্স, আমি থাকব ওরা থাকবে না কেন? ওরা কি বড় লাটসাহেব হয়ে গেছে? নিজেকে লাটসাহেব ভাববেন না। ইউ আর দ্য সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল।’
সভায় সংসদ সদস্যের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক ও জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি ইসরাত জাহান বলেন, আইনশৃঙ্খলা কমিটি জেলার সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম। সেখানে সরকারি কর্মকর্তা ও অন্য অংশগ্রহণকারীদের পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে আলোচনা করা উচিত। বক্তব্য দেওয়ার সময় শব্দচয়নের ক্ষেত্রেও সবাইকে দায়িত্বশীল ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী এবং রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল আমিন উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া জেলা ও মহানগর পুলিশের কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সভায় অংশ নেন।
