ডেঙ্গু যেন কিছুতেই পিছু ছাড়িতেছে না। মশক নিধন অভিযান বাড়িতেছে বটে, কিন্তু ফি বৎসর আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িতেছে পাল্লা দিয়া। তাই এই মুহূর্তে সবচাইতে জরুরি প্রশ্ন হইল, এত আয়োজনের পরও ডেঙ্গু কেন নিয়ন্ত্রণে আসিতেছে না? সমস্যাটি কি কেবল এডিস মশার বিস্তার, নাকি আমাদের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মধ্যেও রহিয়াছে বড় ধরনের দুর্বলতা? ইহার কারণ, ডেঙ্গু এখন আর কেবল নগরকেন্দ্রিক রোগ নহে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা ও বাড়তি আর্দ্রতায় মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হইবার ফলে বিভাগীয় শহর, জেলা-উপজেলা ছাড়াইয়া এখন প্রত্যন্ত গ্রামে পর্যন্ত ডেঙ্গু ছড়াইয়া পড়িয়াছে। শুধু তাহাই নহে, ইহার সঙ্গে যুক্ত হইয়াছে কীটনাশকের কার্যকারিতা লইয়া প্রশ্ন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের এডিস মশার মধ্যে পারমেথ্রিনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে। ইহার অর্থ, একই ধরনের ঔষুধ বারংবার ব্যবহার করিলেই যে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলিবে, সেই নিশ্চয়তা নাই। এই জন্য কোন এলাকায় কোন ঔষুধ কার্যকর, তাহা পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি। অনুমাননির্ভর ঔষুধ প্রয়োগে অর্থ ব্যয় করিয়া লাভ কী?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইল, ধোঁয়া ছড়ানোই মশক নিধনের পূর্ণাঙ্গ সমাধান নহে। ফগিং মূলত উড়ন্ত পূর্ণবয়স্ক মশা মারিতে সহায়তা করে; কিন্তু পানিতে থাকা লার্ভা ও পিউপা ধ্বংস না করিলে নূতন মশা জন্মাইতেই থাকিবে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রও মশার লার্ভা ধ্বংস, জমা পানি অপসারণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কীটনাশক ব্যবহারের সমন্বিত পদ্ধতির উপর গুরুত্ব দিয়া থাকে। সুতরাং, আমাদেরও দৃশ্যমান ধোঁয়ার পরিবর্তে কার্যকর ফলকে অগ্রাধিকার দিতে হইবে। আসল পরিবর্তনটি দরকার এই জায়গাটিতেই। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, মশক নিধন কার্যক্রমের সাফল্য শুধু কতবার ঔষুধ ছিটানো হইল, তাহা দিয়া পরিমাপ করা চলিবে না। বরং কোন এলাকায় কতটি প্রজননস্থল ধ্বংস হইল, ঔষুধ কতটা কার্যকর হইল এবং মশার ঘনত্ব ও আক্রান্তের সংখ্যা হ্রাস পাইলো কি না-এই সকল সূচকের আলোকে সাফল্য বিচার করিতে হইবে। আর সেই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির কাজের স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইভাবে, ওয়ার্ডভিত্তিক ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি করিয়া নিয়মিত হালনাগাদ করিতে হইবে। যেইখানে সংক্রমণ বেশি, সেইখানে আগেভাগেই ব্যবস্থা লইতে হইবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার কথা বলিয়া আসিতেছে দীর্ঘ দিন ধরিয়া। অর্থাৎ, স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার, পরিবেশসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং জনগণকে একই পরিকল্পনার অধীনে কাজ করিতে হইবে। শুধু নগরে নহে, নিয়মিত নজরদারি চালাইতে হইবে গ্রামাঞ্চলেও। বৃষ্টির মৌসুম আসিবার পূর্বেই সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করিয়া সেই মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। সর্বোপরি, জলবায়ুর পরিবর্তিত ধরন বিবেচনায় লইয়া বৎসরব্যাপী প্রস্তুতি গড়িয়া তুলিবার বিষয়ে ভাবিতে হইবে। নাগরিকের দায়িত্বও এই ক্ষেত্রে কম নহে। সপ্তাহে অন্তত এক দিন ঘরবাড়ি ও আশপাশের জমা পানি পরীক্ষা করা এবং ছাদ, ফুলের টব, পানির পাত্র ও পরিত্যক্ত সামগ্রী পরিষ্কার করার রীতি চালু করা হউক। স্থানীয় কর্তৃপক্ষেরও সদা সজাগ থাকিতে হইবে, যাহাতে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, নালা-নর্দমা পরিষ্কার এবং নির্মাণাধীন ভবনে নজরদারি নিশ্চিত করা যায়।
প্রতিটি মৃত্যু নিছক পরিসংখ্যান নহে; বরং ইহা প্রতিরোধব্যবস্থার সম্মুখে একেকটি কঠিন প্রশ্ন। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বৎসর যেমন তিন শতাধিক মৃত্যু ঘটিয়াছে, তেমনি ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যাও লক্ষ ছাড়াইয়া গিয়াছে। এই পরিস্থিতি বাস্তবিক অর্থেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জরুরি প্রয়োজনকে স্পষ্ট করিয়া তুলে। খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রত্যেক নাগরিক ও পরিবারকে সপ্তাহে দুই দিন অন্তত আধা ঘণ্টা করিয়া ঘরবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কারের আহ্বান জানাইয়াছেন। তিনি যথার্থই বলিয়াছেন, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর উপায়। আমরা কি তাহার এই আহ্বানকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দিতে সচেষ্ট হইব না?
