ফ্রান্স হইতে স্পেন, গ্রিস হইতে ইতালি—ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জন-অসন্তোষের বিস্তার একটি মৌলিক প্রশ্নের জন্ম দিয়াছে। ইউরোপকে দীর্ঘকাল সামাজিক নিরাপত্তা, উন্নত নাগরিক পরিষেবা এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার আদর্শ হিসাবে বিবেচনা করা হইয়াছে; কিন্তু উন্নত অর্থনীতি থাকিলেই সাধারণ মানুষের জীবন নির্বিঘ্ন হয় কি? আবাসনের ব্যয় আয়বৃদ্ধিকে ছাড়াইয়া গেলে, তরুনদের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থান দুর্লভ হইলে এবং সরকারি পরিষেবার মান প্রশ্নবিদ্ধ হইলে মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা জন্মায় । অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি তখন ব্যক্তিমানুষের জীবনে স্বস্তি আনিতে ব্যর্থ হয় । ইউরোপের বর্তমান অস্থিরতার নেপথ্যে কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি কারণ রহিয়াছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক বিপর্যয়, পরবর্তী ঋণসংকট, কোভিড-১৯ মহামারির অর্থনৈতিক অভিঘাত এবং ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর জ্বালানি ও খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বহু দেশের অর্থনীতিকে চাপে ফেলিয়াছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদ বৃদ্ধিও ঋণগ্রহণ ও আবাসন অর্থায়নের ব্যয় বৃদ্ধি করিয়াছে। মূল্যস্ফীতি পরবর্তী সময়ে কমিলেও পূর্ববর্তী মূল্যবৃদ্ধির ভার সাধারণ মানুষের জীবন হইতে সম্পূর্ণ দূর হয় নাই। ফলে আয় বৃদ্ধি পাইলেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মান লইয়া অসন্তোষ বৃদ্ধি পাইয়াছে দিনদিন। ইহার সহিত যুক্ত হইয়াছে রাজনৈতিক মেরুকরণ। অভিবাসন, জাতীয় পরিচয়, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মতবিরোধ তীব্র হইতেছে ।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকাশিত ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, গ্রিস, ইতালি, বেলজিয়াম, জার্মানি ও আলবেনিয়ার অস্থিরতার খবর সমগ্র বিশ্বে দেখিতেছে। ফ্রান্সে শিক্ষাব্যয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়; স্পেন, পর্তুগাল ও গ্রিসে আবাসনসংকটের কারণে জনরোষ দানা বাঁধিয়াছে। জার্মানিতে তরুণদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার সম্ভাব্য বিধান লইয়া আপত্তির কথা উঠিয়াছে। আলবেনিয়ায় দুর্নীতি ও বেকারত্ববিরোধী ক্ষোভ দেখা গিয়াছে। ইতালিতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত করা এবং বোরখা-নিকাব নিষিদ্ধ করার উদ্যোগকে কেন্দ্র করিয়া প্রতিবাদ দেখা যাইতেছে । মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সের বিক্ষোভকে শিক্ষাব্যয়ের প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখিয়া ইসলামপন্থিদের অরাজকতা ও ইউরোপের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের প্রচেষ্টা হিসাবে বর্ণনা করিয়াছেন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি অ্যান্সও ইউরোপের অভিবাসননীতির সমালোচনা করিয়াছেন। এই ভাষ্য অভিবাসন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে স্থাপন করে। অন্যদিকে, মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য রো খান্নার বক্তব্যে গুরুত্ব পাইয়াছে সম্পদের বৈষম্য এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিরাপত্তাহীনতা। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়া লেকÍ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরা নুনেজ বিক্ষোভের সহিংসতার জন্য অতি বামপন্থি গোষ্ঠী এবং লুটপাটকারীদের দায়ী করিয়াছেন। অন্যদিকে, কট্টর দক্ষিণপন্থি ন্যাশনাল র্যালির নেতা জর্দান বারদেলা এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলমতের এই বিরোধ দেখাইয়া দেয়, জনরোষের পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলি প্রায়ই আন্দোলনের কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি তাহার দায় নির্ধারণের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইতেছে। সরকার আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দেয়, বিরোধী দল ক্ষমতাসীনদের ব্যর্থতা সামনে আনে, আর জনমতকে প্রভাবিত করিবার জন্য প্রত্যেক পক্ষই নিজস্ব ভাষ্য নির্মাণ করে। ইউরোপের এই পরিস্থিতিকে ২০১০ সালের আরব বসন্তের সহিত তুলনা করিবার কোনো সুযোগ নাই। কারণ, আরব বসন্তের সূচনা হইয়াছিল কর্তৃত্ববাদী শাসন, দুর্নীতি, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে। অন্যদিকে, ইউরোপের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নির্বাচনি ব্যবস্থা ও নাগরিক স্বাধীনতার কাঠামো ভিন্ন। ইউরোপের এই অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। ইউরোপের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতায় পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা ও ব্যাবসায়িক আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হইতে পারে। ইহাতে ভোক্তাদের ব্যয়সংকোচন ঘটিতে পারে, পোশাকের চাহিদা কমিতে পারে এবং আমদানিকারকেরা অর্ডার হ্রাস কিংবা মূল্যছাড়ের চাপ সৃষ্টি করিতে পারেন।
ইউরোপের এই জনরোষের কার্যকর সমাধান প্রয়োজন: প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য তথ্য, কার্যকর সামাজিক নীতি, জবাবদিহি এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা। ইউরোপের অস্থিরতা দূর হইবে জনরোষকে দমন করিবার মাধ্যমে নহে—এই জনরোষের অন্তর্নিহিত কারণগুলি কতখানি দূর করা গেল, তাহা দিয়া ।
