পুলিশের ‘নাকের ডগায়’ এডিশনাল ডিআইজির বাড়িতে বছরজুড়ে মাদকের আসর

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৬

রাজধানীর পূর্বাচলে পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) আবদুল্লাহ আল জহিরের বাড়িতে প্রায় এক বছর ধরে মাদক সেবন, অবৈধ ডিজে পার্টি ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলার অভিযোগ উঠেছে। অথচ বাড়িটি থেকে মাত্র ৩০ গজ দূরেই রয়েছে পুলিশের ছয়তলা একটি ফাঁড়ি। মঙ্গলবার গভীর রাতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানে এসব কর্মকাণ্ডের তথ্য সামনে আসে।

বাড়িটিতে নিয়মিত পার্টির আয়োজন করা হতো। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ির বাইরে প্রায়ই গাড়ি সারিবদ্ধভাবে রাখা থাকত এবং গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চ শব্দে গান বাজত। এসব আয়োজন চললেও দীর্ঘদিন ধরে পুলিশি হস্তক্ষেপ না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।

মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে ডিবির একটি দল বাড়িটিতে অভিযান চালায়। অভিযানে মাদক সেবন ও ডিজে পার্টির অভিযোগ সামনে আসে।

খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মাদ সোহরাব আল হোসাইন বলেন, বাড়িটি একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার বলে তারা জানতেন। সেখানে নিয়মিত সামাজিক অনুষ্ঠানও হতো। তবে ডিজে পার্টি, মাদক সেবন কিংবা অন্যান্য অসামাজিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তারা অবগত ছিলেন না। বিষয়টি জানার পর ডিবি অভিযান চালায়।

ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির জানান, ২০২৫ সাল থেকে বাড়িটিতে প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২টি পার্টির আয়োজন করা হচ্ছিল। অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের যুক্ত করা হতো।

স্থানীয় বাসিন্দা, নিরাপত্তাকর্মী ও মসজিদের ইমামের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক বছর ধরে সেখানে নিয়মিত গান-বাজনা ও নাচের আয়োজন চলছিল। প্রথম দিকে মাসে তিন-চারবার এসব অনুষ্ঠান হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আয়োজনের সংখ্যা বেড়ে যায়। বিশেষ করে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বেশি পার্টি হতো। কোনো কোনো অনুষ্ঠান সকালে শুরু হয়ে রাত পর্যন্ত চলত।

ডিবির তথ্য অনুযায়ী, বাড়িটির পার্টি আয়োজনের ব্যবস্থাপনায় মাহবুব আলম সহ-আয়োজক হিসেবে কাজ করতেন। পার্টি থেকে অর্জিত মুনাফার ৩০ শতাংশ পেতেন তিনি এবং বাকি ৭০ শতাংশ পেতেন অতিরিক্ত ডিআইজি জহির।

বাড়িটিতে মোট ছয়টি কক্ষ ছিল। এর মধ্যে পাঁচটি ভাড়া দেওয়া হতো এবং অন্য কক্ষটিতে থাকতেন তত্ত্বাবধায়ক। এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলা নামের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাড়িটি বুকিং দেওয়া হতো। ১০ জনের জন্য পুরো বাড়ি ও পাঁচটি অতিথিকক্ষের দৈনিক ভাড়া ছিল ১৮ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর কাছ থেকে নিবন্ধন ফি হিসেবে ৬০০ টাকা নেওয়া হতো।

মাহবুবের সঙ্গে সমন্বয় করে সাদমান রিফাত ও পরম গুহ নিয়োগী নামের দুই তরুণ এসব পার্টির আয়োজন করতেন। অংশগ্রহণকারীদের বেশির ভাগই সচ্ছল পরিবারের সদস্য। তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ব্যাংকারও ছিলেন।

অভিযানের সময় বাড়িটিতে প্রায় ২২টি গাড়ি পাওয়া যায় বলে জানান ডিবির উত্তরা বিভাগের ডিসি ইলিয়াস কবির। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তখন সেখানে উচ্চ শব্দে গান বাজছিল এবং পুরো বাড়িতে শিশার ধোঁয়া ছড়িয়ে ছিল।

অভিযানে কম মাদক উদ্ধার নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন 

নিয়মিত মাদক সেবনের অভিযোগ এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতির কথা বলা হলেও প্রায় তিন ঘণ্টার অভিযানে উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণ ছিল তুলনামূলকভাবে কম। ডিবির জব্দতালিকা অনুযায়ী, সেখান থেকে ভারতের তৈরি আইকনিক হোয়াইট হুইস্কির একটি বোতল, এক লিটারের রয়্যাল স্ট্যাগ হুইস্কির বোতলে অবশিষ্ট ৫০০ মিলিলিটার, এক লিটারের রাশিয়ান স্মিরনফ ভদকার বোতলে অবশিষ্ট ২০০ মিলিলিটার এবং দেশীয় কেরু’স ইম্পেরিয়াল হুইস্কির একটি খালি ৭৫০ মিলিলিটারের বোতল উদ্ধার করা হয়।

এ ছাড়া একটি ইয়াবা বড়ি, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম এবং ‘কুশ’ হিসেবে শনাক্ত করা অল্প পরিমাণ একটি পদার্থ জব্দ করা হয়।

অভিযানে ৮৫ জনকে আটক করার পরও মাদকের এত কম পরিমাণ উদ্ধার হওয়ায় পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যেও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে ইলিয়াস কবির বলেন, ডিবি পৌঁছানোর আগেই অংশগ্রহণকারীরা মদ ও ইয়াবা সেবন করেছিলেন। ফলে ঘটনাস্থলে যা অবশিষ্ট ছিল, তা-ই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

ডিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অভিযান চলাকালে মাহবুবকে গ্রেপ্তার না করার অনুরোধ জানিয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি জহির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেন। অভিযানের সময় তিনি ইলিয়াস কবিরকে তিনবার ফোন করেছিলেন বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে জহির বলেন, তত্ত্বাবধায়ক নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন বলে তিনি প্রথমে বিশ্বাস করেছিলেন। বাড়িতে মাদক সেবন নিষিদ্ধসহ নিয়মকানুন অতিথিদের জানানো হয়েছিল বলে তার ধারণা ছিল। দায়িত্ব পালনে অবহেলা না করলে একজন দরিদ্র মানুষকে অযথা হয়রানির শিকার হতে দিতে চাননি তিনি।

জাহির আরও বলেন, মাহবুব তাকে জানিয়েছিলেন, অনুষ্ঠানে ৩৫ থেকে ৪০ জন অংশ নেবেন। কিন্তু পরে ডিবির ব্রিফিং থেকে তিনি জানতে পারেন, সেখানে ৮৪ জন ছিলেন। এতে তার কাছে বিষয়টি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে। বাড়িটির ব্যবস্থাপনায় মাহবুবের ভূমিকা খতিয়ে দেখে অবহেলা বা অনিয়ম পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

৮৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড

অভিযানে বাড়িটি থেকে আটক ৮৫ জনের মধ্যে ২৬ জন নারী ও ৫৯ জন পুরুষ ছিলেন। সংক্ষিপ্ত বিচারিক প্রক্রিয়ায় তাদের সাজা দেওয়া হয়েছে।

পুরুষদের প্রত্যেককে এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে তাদের আরও ১৫ দিন কারাভোগ করতে হবে। অন্যদিকে, নারীদের প্রত্যেককে ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও তিন দিন কারাভোগ করতে হবে।

ইলিয়াস কবির জানান, নিয়মিত বুকিং, অর্থের বিনিময়ে নিবন্ধন এবং ধারাবাহিকভাবে পার্টি আয়োজনের পেছনে সংগঠিত কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করছেন তারা।

সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার

 
ইত্তেফাক/এসজে