পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষায় সম্প্রতি গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত হওয়ায় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ লইতেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের জন্যও ইহা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। কারণ, দেশের নিরাপত্তা এখন শুধু সীমান্ত বা সামরিক শক্তির উপর নির্ভরশীল নহে, তথ্যভান্ডার, আর্থিক ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল সেবার নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য অবহেলাও এই ক্ষেত্রে বড় বিপর্যয় ডাকিয়া আনিতে পারে।
জানা যায়, বিশ্বের অসংখ্য সংবাদমাধ্যম, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও অনলাইন সেবায় ওয়েবসাইট তৈরির একটি বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা ‘পিএইচপি' প্রযুক্তি ব্যবহৃত হইয়া থাকে। সম্প্রতি এই ভাষার নিরাপত্তাব্যবস্থায় দুইটি গুরুতর দুর্বলতা শনাক্ত হওয়ার পর বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করিয়াছেন, দুর্বলতাগুলি কাজে লাগাইয়া হামলাকারীরা পাসওয়ার্ড ছাড়াই দূর হইতে সার্ভারে অননুমোদিত নির্দেশনা কার্যকর করিবার সুযোগ পাইতে পারে। ইহাতে সার্ভারে সংরক্ষিত ফাইল, তথ্যভান্ডার ও গুরুত্বপূর্ণ নথি ঝুঁকির মুখে পড়িতে পারে। যদিও পিএইচপি ব্যবহার করিলেই কোনো ওয়েবসাইট আক্রান্ত হইবে, এমন নহে। ব্যবহৃত সংস্করণ, নিরাপত্তা হালনাগাদ এবং সার্বিক সুরক্ষাব্যবস্থার উপর ঝুঁকির মাত্রা নির্ভর করে। তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় তথ্য বাতায়নের প্রায় ৩৬ হাজার ৫০০টি ওয়েবসাইট পিএইচপিতে তৈরি নহে বিধায় বর্তমান দুর্বলতার কারণে সেইগুলি সরাসরি ঝুঁকিতে পড়িবার কথা নহে; কিন্তু ইহাতে নিশ্চিন্ত থাকিবার অবকাশ নাই। কারণ, জাতীয় তথ্য বাতায়নের বাহিরেও বিভিন্ন অনলাইন সেবায় পিএইচপি ব্যবহৃত হইতে পারে এবং এই সমস্ত ব্যবস্থার নিরাপত্তা যাচাই না করিলে প্রকৃত ঝুঁকি নিরূপণ করা সম্ভব নহে।
ঠিক এমন একটি অবস্থায়, আমরা কি বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতার দিকে তাকাইব না? ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা দেখাইয়া দিয়াছিল, ডিজিটাল নিরাপত্তায় দুর্বলতা কত বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হইতে পারে। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সহিত যুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটি থাকিলে তাহার অভিঘাত স্বাভাবিকভাবেই দেশের সুনাম ও আর্থিক স্থিতিশীলতার উপরও পড়িতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তাজনিত সতর্কতার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখিবার ঘটনাও এই উদ্বেগকে সম্মুখে আনিয়াছে। অবশ্য ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা কোনো কোনো পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হইতে পারে বটে; কিন্তু তাহা দিনের পর দিন বন্ধ রাখা কখনোই কাম্য নহে। এই জন্য প্রয়োজন দুর্বলতা শনাক্ত করা, তাহা দূর করা এবং ভবিষ্যৎ হামলা প্রতিরোধের সক্ষমতা গড়িয়া তোলা। উন্নত দেশসমূহে ইহাই দেখা যায়। সাইবার নিরাপত্তাকে সেইখানে কেবল তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্ব বলিয়া বিবেচনা করা হয় না। সাইবার বা অবকাঠামো নিরাপত্তার বিভিন্ন দুর্বলতা সম্পর্কে যথাসময়ে সতর্কবার্তা দেওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ সাইবার প্রতিষ্ঠানগুলিকে তাহারা নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা, সফটওয়্যার হালনাগাদ, তথ্যের ব্যাকআপ এবং অনুপ্রবেশ শনাক্তকরণব্যবস্থা কার্যকর রাখিবার পরামর্শ দিয়া থাকেন। শুধু তাহাই নহে, গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি মূল্যায়ন, দায়িত্ব নির্ধারণ, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার মহড়া এবং দক্ষ জনবল নিয়োগ ও সার্বক্ষণিক তদারকির মাধ্যমে সম্ভাব্য সাইবার হামলা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ সেইখানে বিশেষ গুরুত্ব পায়। এই সকল উদ্যোগের মূল শিক্ষা হইল, বিপর্যয়ের অপেক্ষায় বসিয়া না থাকিয়া আগাম প্রস্তুতি লওয়াই বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। আমরাও কি সেই পথে হাঁটিব না?
একটি ওয়েবসাইটকে মূল্যবান জমির সহিত তুলনা করা যায়। জমিতে ভালো ফসল ফলাইতে যেমন পরিচর্যা, সেচ ও সুরক্ষাপ্রাচীর প্রয়োজন, ডিজিটাল সম্পদ রক্ষায়ও তেমনি প্রয়োজন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও শক্তিশালী সুরক্ষাবলয়। মনে রাখিতে হইবে, সাইবার নিরাপত্তায় অবহেলার মূল্য কেবল অর্থের অঙ্কে পরিমাপ করা যায় না। নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য, প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নথিও সাইবার হামলায় বিপন্ন হইতে পারে। অতএব, দায়িত্বপ্রাপ্ত পদে দক্ষ লোক নিয়োগ, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং আগাম সতর্কতাকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত করিতে হইবে। ঘরের চাবি পরের হাতে তুলিয়া দেওয়ার মতো পরিস্থিতি এড়াইতে হইলে বিপর্যয়ের পর নহে, বরং বিপর্যয়ের পূর্বেই যথাযথ প্রস্তুতি এবং সতর্কতা গ্রহণ করা হউক।
