'ইরানে হামলা হলে বিশ্ববাজারে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে'

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০০

ইরানের ওপর ইসরাইলের উসকানিতে নতুন করে সামরিক হামলা চালানো হলে বিশ্ববাজারে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তার মতে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে জ্বালানি সরবরাহকারী দেশগুলোর পাশাপাশি ভোক্তারাও বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারেন।

বুধবার এক বার্তায় আরাঘচি বলেন, ইসরাইলের উসকানিতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যেকোনো ধরনের সামরিক দুঃসাহসিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাজারে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। গ্যাস সরবরাহকারী ও ভোক্তা-উভয় পক্ষের জন্যই এটি বড় উদ্বেগের বিষয়। এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে কথিত 'অস্তিত্বগত হুমকি' দূর করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। বুধবার তিনি এ কথা বলেন। নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর নতুন সরকার গঠনের চেষ্টা করছেন নেতানিয়াহু।

গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পক্ষ থেকে ইরানে নতুন করে হামলার সম্ভাবনার কথা সামনে এসেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদিকে রাশিয়ার মস্কোয় অনুষ্ঠিত গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোর ফোরামের (জিইসিএফ) শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন আরাঘচি। সেখানে তার সঙ্গে ছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল পারস্য উপসাগরে নতুন করে সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম এবং পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। আরাঘচির সতর্কবার্তায় সেই ঝুঁকির কথাই উঠে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও একই আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করে বলেছেন, শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বে এর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। তাদের মতে, বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হবে। হামলার ধরন, ইরানের পালটা পদক্ষেপ এবং সংঘাত কতটা বিস্তৃত হয়, তার ওপর নির্ভর করবে এই প্রভাবের মাত্রা। বিশেষ করে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বিশ্ববাজারের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠতে পারে।

তেলের বাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা

ইরান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি। দেশটির তেল উৎপাদন ও রপ্তানি নতুন করে সামরিক হামলার মুখে পড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী দেশের স্থাপনা ও পরিবহনব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়লে পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগকারী এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত
তেল ও জ্বালানি পণ্য পরিবাহিত হয়। এখানে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি নয়, এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহও চাপে পড়তে পারে। ফলে তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবহন ও বিমা ব্যয়ও বাড়তে পারে।

প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও চাপ
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী অঞ্চল। বিশেষ করে কাতারের এলএনজি রপ্তানি আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইরানকে ঘিরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে কিংবা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। এতে এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতাদের বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলস্বরূপ গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সারশিল্প ও অন্যান্য জ্বালানিনির্ভর শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে।

শেয়ার বাজার ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব
যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়লে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে অর্থ সরিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে বিভিন্ন দেশের শেয়ার বাজারে দরপতন ও লেনদেনে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে বিমান পরিবহন, পর্যটন, উৎপাদনশিল্প এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভর কোম্পানিগুলো ব্যয়ের চাপের মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে, তেলের দাম বাড়লে কিছু জ্বালানি উৎপাদনকারী কোম্পানি লাভবান হতে পারে। তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশকে দুর্বল করতে পারে।

স্বর্ণ ও ডলারের বাজারে পরিবর্তন
আন্তর্জাতিক সংকটের সময় স্বর্ণের চাহিদা বাড়তে পারে। বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ অনিশ্চয়তার মধ্যে সম্পদের মূল্য ধরে রাখার জন্য স্বর্ণ কিনতে আগ্রহী হন। তবে স্বর্ণের দাম নির্ভর করে ডলারের শক্তি, সুদের হার ও অন্যান্য আর্থিক পরিস্থিতির ওপরও। একইভাবে, সংকটের সময় ডলারের চাহিদা বাড়লে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।

পরিবহন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি
সামরিক সংঘাতের কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে ঝুঁকি বাড়লে জাহাজের বিমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি, বিকল্প পথে চলাচল এবং পণ্য পৌঁছাতে বেশি সময় লাগার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় বাড়বে। জ্বালানি, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের এই বৃদ্ধি একপর্যায়ে খাদ্য, রাসায়নিক পণ্য, সার এবং অন্যান্য শিল্পপণ্যের দামে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে বিশ্ববাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। এতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার ও মুদ্রানীতি পরিচালনাও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

ইত্তেফাক/এএম