পৃথিবীর আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে এমন প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিবর্তনের ঘটনাগুলোর মধ্যে চলতি বছর সব রেকর্ড ভেঙে এক বিধ্বংসী রূপ ধারণ করেছে 'এল নিনো'। সমুদ্র থেকে অস্বাভাবিক পরিমাণ তাপ নির্গমন করে চলেছে এই জলবায়ু বিন্যাস, যার প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা দিচ্ছে তীব্র খরা, বন্যা ও ভয়াবহ ঝড়। সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা রেকর্ড ৩ দশমিক ৩৮ ডিগ্রি বড়িয়ে দিয়েছে এই পরিবেশগত পরিস্থিতি, যা এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা যে কোনো এল নিনোর চেয়ে অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যে একে 'সুপার এল নিনো' নামে অভিহিত করছেন। জলবায়ু সংক্রান্ত গবেষণা সংস্থা 'ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব'-এর তৈরি একটি মানচিত্র দেখিয়েছে, রেকর্ড ভাঙা এই উত্তাপের কারণে বিশ্বের কোথায় সবচেয়ে বেশি মানুষ প্রাণ হারাবেন।
'এল নিনো হিট মর্টালিটি ট্র্যাকার' নামে প্রকাশিত ঐ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, তীব্র তাপদাহের কারণে আগামী ছয় মাসে বিশ্ব জুড়ে অতিরিক্ত ৩ লাখ ৭৩ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হবে।
ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, চরম তাপদাহের প্রাণঘাতী প্রভাব আগে থেকেই অনুমান করতে পারা একটি বড় অর্জন। এর অর্থ হলো আমরা চিহ্নিত করতে পারছি বেদন এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছেন এবং জীবনহানি ঘটার আগেই নীতিনির্ধারকদের পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছি। আমরা বর্তমানে যে সুপার এল নিনোর মুখোমুখি হয়েছি, এই ট্র্যাকার সেটিরই তথ্য সরবরাহ করছে। হতাশাজনক এই পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এল নিনোর তাপদাহে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটবে বৈশ্বিক দক্ষিণ বা গ্লোবাল সাউথে। এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে রয়েছে ভারত।
ট্র্যাকারটির দাবি অনুযায়ী, অক্টোবার থেকে মার্চের মধ্যে ভারতে প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ অতিরিক্ত গরমে মারা যেতে পারেন, যার বেশির ভাগই ঘটবে মার্চ মাসে। ট্র্যাকারটি আরো পূর্বাভাস দিয়েছে যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল বা হটস্পট হিসেবেই থাকবে, যেখানে এল নিনোর তাপদাহে ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ২৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এর পরেই রয়েছে ব্রাজিল, যেখানে নিহতের সংখ্যা ১৯ হাজারে পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে চলতি সপ্তাহের শুরুতে এক আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ জানান, এল নিনোর প্রভাবে ভারতের মুম্বাই শহরে বায়ুদূষণ পরিস্থিতি আরো গুরুতর হতে পারে। এসএএফএআর-এর প্রতিষ্ঠাতা-প্রকল্প পরিচালক এবং এনআইএএস, আইআইএসসি-এর চেয়ার প্রফেসর ড. গুফরান বেগ জানান, মুম্বাইয়ের মতো শহরে বৃহৎ আকারের বাতাস চলাচল ধীরগতির হয়ে পড়বে। এর অর্থ হলো শক্তিশালী বাতাস থাকলে শহরটি যে প্রাকৃতিক সুরক্ষা পেয়ে থাকে, তা তারা হারাবে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) ইতিমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছে যে, ১৯৫০ সালের পর এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো এবং এর মূল প্রভাব বা চরম পর্যায় এখনো বাকি। জাতিসংঘের এই আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক সংস্থাটি জানিয়েছে, ডিসেম্বরের সম্ভাব্য চরম পর্যায়ের আগে এল নিনো আরো তীব্রতর হবে। এটি বিশ্বের বেশির ভাগ অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা নিয়ে আসতে পারে এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এনে বিভিন্ন অঞ্চলে খরা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সংস্থাটি আরো জানিয়েছে যে এল নিনোর এই প্রভাব ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। মূলত এল নিনো মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা বিশ্ব জুড়ে বাতাস, চাপ এবং বৃষ্টিপাতের বিন্যাসে বৈশ্বিক পরিবর্তন এনে থাকে। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর এই জলবায়ু পরিবর্তন ঘটে এবং এটি প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়। এই পরিস্থিতি মূলত এল নিনো এবং এর বিপরীত রূপ 'লা নিনা'-র মধ্যে আবর্তিত হতে থাকে, যার মাঝামাঝি সময়ে আবহাওয়া স্বাভাবিক অবস্থায় বিরাজ করে।
