নওগাঁর বাকি ৫ জনের মরদেহ দেশে আসছে শনিবার, শোকের মাঝেও ঋণের চাপ

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৬

অবশেষে শেষ হচ্ছে দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার প্রহর। সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর বাকি পাঁচজনের মরদেহ দেশে আসছে শনিবার (৩১ অক্টোবর)। ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে শনাক্ত হওয়ার পর তাদের মরদেহ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন দেশটির সরকার।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ দুতাবাস রিয়াদ, সৌদি আরবের কাউন্সেলর মুহাম্মদ রেজায়ে রাব্বি সাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় সংঘটিত অগ্নিকাণ্ড ১৬ জন বাংলাদেশী কর্মী মৃত্যুবরণ করেন। এরমধ্যে গত ২৭ আগস্ট ৯ জনের মরদেহ বাংলাদেশে প্রেরণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৭টি মরদেহের পরিচয় ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে সনাক্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে মরদেহসমূহ বাংলাদেশে প্রেরণের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। 

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি ৩৩৬ নম্বর ফ্লাইটে আগামীকাল সকাল ৮ টা ০৫ মিনিটে মরদেহসমূহ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে।

দেশে ফিরতে যাওয়া পাঁচ প্রবাসী হলেন- নওগাঁ শহরের পার নওগাঁ এলাকার মজনু রহমানের ছেলে শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের নাজমুল হুদার ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ, একই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের আক্কাস প্রামানিকের ছেলে মিনহাজ প্রামানিক, মাধবপুর গ্রামের মজনু সরদারের ছেলে মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের আজহার আলীর ছেলে সাগর আলী।

এর আগে, গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন বাংলাদেশি প্রবাসী প্রাণ হারান। তাঁদের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন নওগাঁ জেলার বাসিন্দা। গত ২৭ আগস্ট প্রথম দফায় সাতজনের মরদেহ দেশে আনা হলেও আইনি প্রক্রিয়া ও পরিচয় শনাক্তকরণ জটিলতায় বাকি পাঁচজনের মরদেহ সৌদির হিমঘরে পড়ে ছিল।

প্রিয়জনের মুখটি শেষবারের মতো দেখার আকুতি নিয়ে এতদিন প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন স্বজনেরা। আত্রাইয়ের সত্তরোর্ধ্ব মজনু সরদার ও ছাইদা বেগম দম্পতি ছেলে মাসিদুল সরদারের মরদেহের খোঁজে প্রতি সপ্তাহে লাঠিতে ভর দিয়ে ছুটে যেতেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে। অশ্রুসিক্ত চোখে মজনু সরদারের আকুতি ছিল, মৃত্যুর আগে অন্তত ছেলের মুখটি শেষবারের মতো দেখতে চান। অবশেষে তাদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। 

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, নিহত পরিবারগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওয়েজ অর্নার্স বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে মরদেগুলো কীভাবে দ্রুত আনা যায় সেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পরিচয় শনাক্ত হওয়া নওগাঁর বাকি পাঁচ জনের মরদেহ আসছে। পাঁচজনের মধ্যে চারজনের বাড়ি আত্রাই উপজেলাতে এবং একজনের বাড়ি নওগাঁ সদর উপজেলায়।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালায়ের বরাত দিয়ে ইউএনও আরও বলেন, সৌদি আরবের অগ্নিকাণ্ডের নিহতের ঘটনায় শুরুতে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১৩ জন নিহতের খবর পাওয়া গেলেও বর্তমানে আত্রাই উপজেলার ১১ জন এবং নওগাঁ সদর উপজেলার একজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। 

এদিকে মরদেহ দেশে ফেরার খবরে স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটলেও পরিবারগুলোর সামনে দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। বিদেশে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ভিটেমাটি বন্ধক রেখে কিংবা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন নিহত প্রবাসীরা। তাদের স্বপ্ন অগ্নিকাণ্ডে শেষ হলেও দেশে রয়ে গেছে ঋণের বিশাল বোঝা।

আত্রাই উপজেলার সাধনগর গ্রামের নিহত সাগর আলীর স্ত্রী পারভীন খাতুন জানান, মাত্র ছয় মাস আগে স্বামীকে সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন। পরিবারের একমাত্র সম্বল ভিটেবাড়িটিও মহাজনের কাছে বন্ধক রয়েছে। এরই মধ্যে ঋণের এক লাখ টাকাও পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। দুই অবুঝ সন্তানকে নিয়ে এখন পাওনাদারদের তাগাদায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।

ইত্তেফাক/এনটিএম