এমন মানবজমিন রইল পতিত, আবাদ করলে ফলত সোনা-রামপ্রসাদের এই মরমি গানের মধ্যে রহিয়াছে মানুষের সম্ভাবনা ও তাহাকে কাজে লাগাইবার এক গভীর দর্শন। একটি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও কথাটি সমভাবে প্রযোজ্য। যেই রাষ্ট্রের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী যত দক্ষ, উৎপাদনশীল ও কর্মমুখী, সেই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি তত শক্তিশালী। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই মানবজমিনের বিপুল অংশ এখনো অনাবাদি। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়িতেছে, অথচ সেই মানুষগুলির জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হইতেছে না। ইহা যে কত বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস, বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন তাহাই চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিয়াছে। বিশ্বব্যাংকের 'ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট' শীর্ষক ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত ২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাইবে। ইহার পর বাড়িতে থাকিবে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা। ২০৫১ সালের মধ্যে ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সিদের অনুপাত দাঁড়াইবে ১৪ শতাংশে। অর্থাৎ ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পূর্বেই বাংলাদেশকে বয়স্ক সমাজের বাস্তবতার সম্মুখীন হইতে পারে। জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাইবার এই সময়টুকু তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সেই সুযোগ কাজে লাগাইবার প্রস্তুতিতে আমাদের ঘাটতি বিস্তর।
ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনের কয়েকটি পরিসংখ্যান বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের কর্মক্ষম মানুষের ৮৪ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। স্নাতক বা তদূর্ধ্ব শিক্ষিত ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশেরও অধিক যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি না পাইয়া অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হইতে বাধ্য হইতেছেন। এই খাতের আয় আনুষ্ঠানিক খাতের তুলনায় ৪৫ হইতে ৮৪ শতাংশ কম। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বার্ষিক হার মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ। ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের গড় হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আমরা অর্ধেক গতিতে চলিতেছি। প্রশ্ন হইল, এত বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও আমরা তাহাদের কাজে লাগাইতে পারিতেছি না কেন? উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করিয়াও তরুণদের একটি বড় অংশ যদি যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পান। ডিগ্রি প্রদানই শিক্ষার সাফল্য নহে। সেই শিক্ষা মানুষের কর্মদক্ষতা, সৃজনশীলতা ও উৎপাদনশীলতা কতখানি বাড়াইল, তাহাই বিবেচ্য। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ, শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের বাধা দূর করিতে হইবে। জনসংখ্যার অর্ধেককে কর্মক্ষেত্রের বাহিরে রাখিয়া কোনো রাষ্ট্রই তাহার পূর্ণ অর্থনৈতিক সামর্থ্য অর্জন করিতে পারে না।
জনমিতিক পরিবর্তনের আরেকটি দিকও উপেক্ষা করিবার সুযোগ নাই। বয়স বাড়িবার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার প্রয়োজন বাড়িবে। অথচ প্রতিবেদনে দেখা যাইতেছে, দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করিলেও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাত্র ২০ শতাংশ সেইখানে কর্মরত। শহরে চিকিৎসকের ঘনত্ব গ্রামের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি। আজ যাহারা দেশের অর্থনীতিতে শ্রম দিতেছেন, বার্ধক্যে তাহাদের দায়িত্ব কে লইবে? একটি সরকারের সাফল্যের সবচাইতে বড় মাপকাঠি হইল-সেই সরকার কত মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করিতে পারিল, কত তরুণ নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ দিতে পারিল, শ্রমের যথাযথ মূল্য কতখানি নিশ্চিত হইল। সুতরাং, আগামী দুই দশকে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারে কার্যকর পদক্ষেপ লইতে হইবে। আজ যাহাদের কাজে লাগানো যাইতেছে না, আগামী দিনে তাহাদের হারানো কর্মক্ষমতার ক্ষতিও পূরণ করা সম্ভব হইবে না। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের বুঝিতে হইবে, জনসংখ্যার অনুকূল বয়সবিন্যাস নিজে নিজে সমৃদ্ধি আনে না। তাহাকে সম্পদে পরিণত করিবার জন্য প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, সুশাসন ও বাস্তবায়নের সদিচ্ছা। কর্মক্ষম মানবজমিন অনাবাদি রাখিয়া উন্নত দেশ নির্মাণের প্রত্যাশা করা যায় না।
