পরিবেশগত দায়বদ্ধতা ও ডেঙ্গু

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০১৯, ২০:৫৬

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রভাব পড়ছে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার ওপর। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঋতুবৈচিত্র্য ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন রোগের সম্পর্ক আছে, ফলে একই রোগ ভিন্ন ভিন্ন ধরন ও লক্ষণ নিয়ে দৃশ্যমান হচ্ছে। আগে যেসব জায়গায় মশা টিকতে পারত না, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সেসব জায়গায় মশা অবস্থান করছে। বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় এডিস মশার বংশবিস্তার বেশি হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে  দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে ডেঙ্গু ব্যাপকতা লাভ করেছে। বিশ্বে জলবায়ুগত দুর্যোগের শিকার হয়ে লাখ লাখ মানুষ খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে কোনো না কোনোভাবে বিভিন্ন রোগের বিস্তারে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। ডেঙ্গু নির্মূলে শুধু ওষুধ প্রয়োগে কাজ হবে এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। কয়েকটি বিষয় এখানে বিবেচনায় আনতে হবে—১. পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, ২. ওষুধ ছিটানো এবং ৩. জনগণের দায়বদ্ধতা। রাজধানী ঢাকা শহরকে আমরা যদি বিবেচনায়  নেই, তাহলে দেখা যাবে ঢাকা শহরের পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা বেশ নাজুক। অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ঢাকা শহর আজ নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন। শহরের সার্বিক প্রতিবেশব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য নেই বললেই চলে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও বেশ নাজুক। বিভিন্ন প্রকার দূষণ শহরবাসীর নিত্যসঙ্গী! জনঘনত্ব এ শহরে সর্বাধিক। একটু বৃষ্টি হলেই সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে পানি জমে যায়। শহরের প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। দখল-দূষণে জর্জরিত হয়ে খালগুলো যেন এক একটি মশা তৈরির কারখানা! এ শহরের খাল-নালাগুলোর পানিও প্রবাহমান নয়। ঢাকার বাস্তুসংস্থান বা ইকোসিস্টেম একসময় এমন ছিল যে, এখানে মশা কম হতো অর্থাত্ বাস্তুসংস্থানগত ভারসাম্য মোটামুটি ভালো ছিল। এখন ব্যাঙ, চামচিকা, টিকিটিকি এ শহরে নেই বললেই চলে! এগুলো মশা খেত। তবে বিষয়টি এমন নয় যে, ডেঙ্গু এবার প্রথম বিস্তার লাভ করেছে এ শহরে। পরিবেশ ও জলবায়ুগত অবস্থার কারণে ডেঙ্গু তার ধরন বদলেছে। বিভিন্ন ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসের কথা শোনা যাচ্ছে। এটা নিশ্চিত হওয়া জরুরি যে, ঠিক কোন ধরনের ভাইরাস এখন সক্রিয় রয়েছে। এটা নিশ্চিত  হতে না পারলে সে অনুযায়ী ওষুধ ছিটানো যাবে না। একটা বিষয় নিশ্চিত যে, দীর্ঘদিন যখন কোনো কীটনাশক ব্যবহার করা হয় তখন তার সঙ্গে ঐ নির্দিষ্ট ধরনের কীটপতঙ্গ ধীরে ধীরে নিজেকে সহনশীল করে ফেলে। ফলে ওষুধের কার্যকারিতা হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেক্ষেত্রে ভাইরাসের ধরন বুঝে নতুন কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়। এ ব্যাপারে বিদেশের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগানো যেতে পারে। জনগণের সম্পৃক্ততা না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষে পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব হয় না।

এডিস মশার উত্সস্থল ধ্বংসে জনসাধারণই মূল ভরসা। কেননা বাসাবাড়ি, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায়, আমাদের চারপাশে এডিস মশার লার্ভা তৈরির বহু ক্ষেত্র থাকে। শীতকালেও ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার ডিম  থেকে যায়। এই ডিমে একটু বৃষ্টির পানির ফোঁটা পড়লেই লার্ভার জন্ম হয়। শুষ্ক ও আর্দ্র উভয় মৌসুমে এডিস মশা সক্রিয় থাকে। এজন্য মশা ও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। ঢাকা শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এ ব্যাপারে কার্যক্রম নেওয়া যেতে পারে। গঠন করা যেতে পারে ওয়ার্ডের সদস্যসহ তরুণদের সম্পৃক্ত করে স্বেচ্ছাসেবী দল। বাসাবাড়িসহ আশপাশ, নিজের বাসাবাড়ির সামনের নালা ও রাস্তাঘাট অপরিচ্ছন্ন থাকলে বা পানি জমলে জবাবদিহি করতে হবে—এমন কিছু ভাবা যেতে পারে। তার আগে কর্তৃপক্ষকেও নিজেদের জবাবদিহিতার জায়গাটাও পরিষ্কার করতে হবে! কেননা কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার চর্চা থাকলেও জনসাধারণও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসবে।

ঢাকা