বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যে ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। ধারাবাহিক উন্নয়নের নেপথ্যে রয়েছে রফতানি তালিকার প্রধান পণ্য তৈরি পোশাক খাতে গত ৫ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন সংস্কারের সুফল। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের গত চার মাসে মোট এক হাজার ৩৬৫ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে যা আগের বছরের তুলনা ২১৫ কোটি ডলার বেশি। শতাংশের হিসাবে বেড়েছে ১৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। আর লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৩ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি সুবিধা উঠে গেলেও বাংলাদেশের রফতানি বেড়েছে। ইউরোপীয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে জিএসপি সুবিধা অব্যাহত থাকায় ইউরোপের বাজারও ধরে রেখেছে। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বাংলাদেশকে নতুন নতুন অঞ্চলের বাজারের দিকে দৃষ্টি দিতে হচ্ছে। ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নভুক্ত (ইইইউ) এবং কমনওয়েলথ অব ইনডিপেনডেন্টস স্টেটস (সিআইএস) দেশগুলোতে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্যগুলো শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে তা নির্ভর করছে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতা ও দর কষাকষির মাধ্যমে দেশগুলো থেকে এ সুবিধা আদায় করে নিতে পারে, তার ওপর। ইইইউভুক্ত দেশগুলো হচ্ছে— রাশিয়া, বেলারুশ, কাজাখস্তান, আর্মেনিয়া ও কিরগিজস্তান আর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯১-৯৩ সালে যে ১১টি দেশ স্বাধীন হয়, এগুলোকে এক সাথে বলা হয় সিআইএস। জানা যায়, জিএসপি সুবিধার ব্যাপারে রাশিয়া সম্মত হয়েছে, তবে অন্যদেরও সম্মতি প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে ইউরেশীয় অর্থনৈতিক কমিশনের নির্বাহী কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন। জানা যায়, বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্যের নতুন দোয়ার খুলছে রাশিয়া। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা বাণিজ্য জটিলতা কাটাতে একমত হয়েছে দুই দেশ। দুই দেশের মধ্যে শিগগিরই চালু হচ্ছে ব্যাংকিং সুবিধা। ওয়ার হাউজ স্থাপনসহ বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত পণ্যবাজার সুবিধা দিতে উদ্যোগী হয়েছে রাশিয়া।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ভৌগোলিক দূরত্ব, সরাসরি যাতায়াত প্রতিবন্ধকতা, শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতা এবং ব্যাংক সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও ২৬ বছরে দেশটিতে রফতানি বেড়েছে প্রায় ২০ গুণ। আমদানি বেড়েছে এর চেয়েও বেশি, প্রায় ৫৩ গুণ। এর মধ্যে বিগত ১০ বছরেই রফতানির পরিমাণ সোয়া ১১ গুণ এবং আমদানি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ১৯৯১-৯২ অর্থ বছরে রাশিয়ায় রফতানির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৬৯ লাখ মার্কিন ডলার এবং আমদানি ১ কোটি ১৮ লাখ ডলার। সেটা ২০১৩-২০১৪ অর্থ বছরে বেড়ে রফতানি দাঁড়ায় ২৮ কোটি ৩৩ লাখ ডলার এবং আমদানি ২৮ কোটি ৬৪ লাখ ডলার। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যেও পরিমাণ ছিল ১৬০ কোটি ডলার যা আগের বছরের তুলনায় ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে রাশিয়ায় বাংলাদেশের রফতানি ৮৮ দশমিক ২০ লাখ ডলারের পণ্য, যা আগের বছরের চেয়ে ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। আর একই সময়ে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশের আমদানি ৭৬ কোটি ২৯ লাখ ডলারের পণ্য, যা আগের বারের চেয়ে দশমিক ৬ শতাংশ কম।
রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্রুতগতিতে বাড়ছে। প্রতি বছরই রফতানি ও আমদানি পরস্পর রেকর্ড ভেঙ্গে চলেছে। বিভিন্ন বিষয়ে রাশিয়া বাংলাদেশকে সহায়তা দিয়ে থাকে। রাশিয়া বাংলাদেশে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণে প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এটি দেশে সবচেয়ে বৃহত্ বিদেশি বিনিয়োগ। এখানে ২ হাজার ৪শ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদিত হবে। আগামী ২০২৪ সালে এটি চালু হওয়ার কথা আছে। রাশিয়ার মুদ্রা রুবলের সঙ্গে বাংলাদেশের মুদ্রা টাকার সরাসরি বিনিময় হার চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের সরাসরি কোনো ব্যাংকিং যোগাযোগ নেই এবং কোনো এলসিও খোলা হয় না। বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ পণ্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশ হয়ে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে রাশিয়ায় রফতানি হচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত খরচের পাশাপাশি এতে বাড়ছে দীর্ঘসূত্রতা। আবার বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধির খবর হচ্ছে বাংলাদেশে খুব সিগ্গিরই রাশিয়ার বাণিজ্যিক একটি ব্যাংক চালু হতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে সম্ভাব্য ব্যাংকের নামও প্রস্তাব করেছে দেশটি, তা হচ্ছে ‘স্পুটনিক ব্যাংক’। দুই দেশের সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে চূড়ান্ত আলোচনা ও সমঝোতা চুক্তির পরপরই ব্যাংকটি কার্যক্রমে আসবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি চালু হলে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার লেনদেন নির্বিঘ্নে করা সম্ভব হবে। শুধু ব্যাংক লেনদেনের জন্যই নয়, বিদ্যুত্, জ্বালানি, বাণিজ্য, বিজ্ঞান, কারিগরি ও তথ্যপ্রযুক্তির বিষয়ে সহায়তা, সরাসরি বিমান ও সমুদ্রপথে যোগাযোগ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির দ্বারও উন্মোচিত হতে যাচ্ছে দুই দেশের মধ্যে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের রফতানি পণ্যে বহুমুখীকরণ ও নতুন বাজার অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে রাশিয়া সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দেশ। এ বাজারটিকে ভালোভাবে পরিচর্যা করা এবং আলোচনার মাধ্যমে বাণিজ্য সুবিধাগুলো পক্ষে আনা গেলে বাংলাদেশই বেশি লাভবান হবে। জানা যায়, সম্প্রতি বাংলাদেশ-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে রাশিয়ায় দক্ষ মানবশক্তি রফতানিরও অপার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ-রাশিয়া ফ্লাইট চালু হওয়ার কথাও রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক বাণিজ্য যোগাযোগে এলসি সুবিধার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। এটি বাণিজ্য ক্ষেত্রে ব্যাংকিং অসুবিধাগুলো দূর করবে।
