সকাল থেকে শুরু। বৃষ্টি যেন রাগান্বিত। ইদানীং গরম যেমন রাগন্বিত, বৃষ্টিও তেমন! বর্ষায় ভারী বর্ষণ। ঘণ্টাখানেক বৃষ্টি হলেই রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়া নতুন কিছু নয়। হাসানের বৃষ্টিতে অভক্তি নেই। মাজা পানি, গলা পানি বা ডোবা রাস্তায় পথ চলা ভিন্নস্বাদের। বেরসিক মোবাইল তো আর স্বাদ বোঝে না। বৃষ্টির পানি খেয়ে মরণাপন্ন অবস্থা। অবস্থা অপরিবর্তিত থাকায় সাত সকালে ভালো করে পলিথিনের প্যাকেটে মুড়ে বের হওয়া। সার্ভিস সেন্টারে যেতে হবে। রাস্তায় খুব একটা যানবাহন নেই। উপরিভাগ থেকে নিজের পরিচয় প্রকাশ করছে অল্প সংখ্যক রিকশা। রিকশাচালক পালবিহীন নৌকার মাঝির মতো বহুকষ্টে সামনে এগোচ্ছে। দু-একটা প্রাইভেট কার স্পিডবোটের মতো ঢেউ তুলে সামনে ছুটছে। রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে ঢেউগুলো যখন শরীর দুলিয়ে দেয়, দেহমনে ভালোলাগার আবেশ, প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ে। সার্ভিস সেন্টারে পৌঁছাতে সাড়ে এগারটা বাজে। একজন সুন্দরী মেয়ে বসে আছে। সামনে বেশকিছু কাগজপত্র।
মোবাইলটা এগিয়ে দিতেই মেয়েটা রুক্ষ কণ্ঠে বলল, ‘এখানে আর সার্ভিস সেন্টার অফিস নেই?’ অফিস কোথায় জানতে চাইলে উত্তর দেন, ‘অফিস টোটালি বন্ধ হয়ে গেছে।’ হাসান অবাক! দুই বছর প্রোডাক্টের ওপর ফ্রি সার্ভিস! এখন অফিসই নেই! মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতেই দায়িত্বপালনকর্তা তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন। প্রোডাক্ট যে আছে, সেটা যে কোম্পানি কেড়ে নেয়নি, তাতেই সন্তুষ্ট থাকেন। তাই তো! সন্তুষ্ট থাকতে হবে। সন্তুষ্ট মনে রাস্তায় বেরিয়ে দেখা বাদল সাহেবের সঙ্গে। মাজা পানি মাড়াতে মাড়াতে ভদ্রলোক এলেন। মাথা থেকে রক্ত ঝরছে। জামায় রক্ত আর পানি মিলেমিশে একাকার। এমন হলো কিভাবে?
বাদল সাহেব ক্যা-কু করে বললেন, ‘রিকশা গর্তে পড়ে গিয়েছিল...।’
দ্রুত তার একটা হাত ধরে কাছের একটা হাসপাতালে উপস্থিত হলো হাসান। হাসাপাতালে মানুষ সাধ করে যায় না। হাসানও যায়নি। মানুষ কিলবিল করছে। ভিড় ঠেলে ভেতরে রিসিপশনে গেল। এখানেও সুন্দরী মেয়ে! জানতে চাইল, ‘ম্যাডাম, আমার একজন রোগী আছে।’
—তো?
—তো কি! ডাক্তার দেখাব।
—বাইরে কিলবিল করা মানুষের ভিড় দেখেন?
—জি দেখি। আমার তো চোখে প্রবলেম না।
হাসানের কথায় মেয়েটা ক্ষিপ্ত হয়, ‘যান, বাইরে যান।’
হাসান অবাক হয়, আপু ম্যাডামরাও আজকাল অল্প কথায় রুক্ষ হয়ে উঠছে কেন বুঝে উঠতে পারে না! বিনীতভাবে বলল, ‘অসুস্থ রোগী।’
—অসুস্থ, মরেনি তো।
—না।
—বেঁচে আছে, এই বেশ। সন্তুষ্ট মনে চলে যান, না হলে সিরিয়ালে দাঁড়ান।
সিরিয়াল দোতলা থেকে নিয়ে নিচতলা পেরিয়ে রাস্তায় নেমে গেছে! বাদল সাহেব ক্যা-কু করছেন। হাসান সান্ত্বনা দেয়, ‘সবসময় সন্তুষ্ট, প্রফুল্ল থাকতে হবে।’
প্রফুল্ল নামে একজন নামকরা ডাক্তার আছেন। তিনি অবশ্য ভালো মানুষ। সেই সন্তুষ্ট প্রফুল্ল থাকার পাশাপাশি মানুষের সেবা করেন। হাসান বাদল সাহেবকে নিয়ে ভিড়ে মিশে যায়। ভিড় পেরোনোর সময় একজন প্রশ্ন করে, ‘কী হয়েছে ভাই?’
বাদল সাহেবই জবাব দেন, ‘গর্তের ভেতর পড়ে গেলাম। রাস্তায় কোথায় বড় বড় ডোবা নালা সেটা তো পানিতে ডুবে গেলে বোঝার উপায় থাকে না। বর্ষা এলে গর্তে খোড়া লোকদের কাজ আরো বেড়ে যায়।’
লোকটা মিনমিন করে বলে, ‘ও। তা কাজ কবে শেষ হবে!’
—কাজ কবে শেষ হবে তা তিনি কিভাবে জানবেন! আপনি কি পাগল নাকি?
হাসানের কথা শেষ হতেই দেখে স্বাভাবিক মেজাজের লোকটার দুটো লাল চোখ। মেঘ-বৃষ্টির দিনে যেন আগুন বেরোবে! হাসান সন্তুষ্ট মনে বাদল সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসে। শেষমেশ এক হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে সেলাই করে বাড়ির পথ ধরে।
তখনো বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশ ভরা কালো মেঘ। বাড়ির কাছাকাছি। পেছন থেকে জোরাল শব্দের ডাক, ‘এই যে হাসান ভাই!’ হাসান পেছন ফেরে। কুরিয়ার সার্ভিসের লোক। বৃষ্টিতে ভিজে জবুথবু অবস্থা, ‘ধরেন আপনার একটা চিঠি আছে।’ প্রেরক রিতা। বেশ আগের ফেসবুক বন্ধু, ভালোবাসা। মাঝে মাঝে ভালোবাসায় বিচ্ছেদ ঘটে যায়। ইচ্ছায়, অনিচ্ছায়। টাচ ফোনটা চুরি হওয়ার পর কমদামি একটা মোবাইলেই চলছিল। সেটাও গেছে। সিম তুলি তুলি করে এখনো তোলা হয়নি। ছোট বোনের একটা সিম ব্যবহার করছে। এজন্য রিতার সঙ্গে ইচ্ছা থাকলেও আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠিটা খুললে। অল্প কিছু কথা। হাসান প্রফুল্ল হূদয়ে পড়তে শরু করে, ‘তোর জন্য অনেক সাধ করে এক জোড়া জুতা কিনেছি। জুতা খায় না পরে—এসবের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে আমি যাব না। জুতা জোড়া সযত্নে তুলে রাখা। মরে যাওয়ার একদিন আগেও যদি দেখা হয়! আমার সামান্য শক্তিও যদি অবশিষ্ট থাকে! আমি চেষ্টা করব তোকে দেখার। জুতা পরলে তোকে কেমন দেখায়! জুতা পরাব বড় সাধ করে। পায়ে না। গলায়? আজকের দিনে এটাই আমার সান্ত্বনা।’ হাসান সন্তুষ্ট চিত্তে চিঠিটা আকাশের দিকে ছুড়ে দেয়। নিজের মনকে বলে, ‘তবু বেশ ভালো আছি।’
