সময়টা পাল্টেছে। শিক্ষার প্রসারের সঙ্গে এখন গুণগত মানকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাস্তবিকভাবেই গুণগত ও মানসম্মত শিক্ষা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। জাতীয় উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন ও গতিশীল সমাজ গঠনে গুণগত শিক্ষা চালকের ভূমিকা নিতে পারে। গুণগত ধারার এ শিক্ষার শুরু হতে হবে প্রাথমিক অবস্থা থেকেই। শিশুদের কচি মনে প্রকৃত শিক্ষার বীজটা বপন করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষার প্রারম্ভিক পর্যায়। সন্দেহ নেই, প্রাথমিক শিক্ষাই হচ্ছে সকল শিক্ষার মূল ভিত্তি।
সমৃদ্ধ ও উন্নত আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও আধুনিকায়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। রূপকল্প ২০২১ বা জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য জনসম্পদ উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে এখন মানসম্মত শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গুণগত মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা পরবর্তী শিক্ষার মূল ভিত্তি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় সবচেয়ে বেশি। শিক্ষার প্রারম্ভিক পর্যায়টা সম্পন্ন করার পর শিক্ষার্থীদের অনেক ক্ষেত্রেই ছেড়ে দেওয়া হয়। অর্থাত্ শিক্ষার লাইন ভিন্ন করে দেওয়া হয়। কেউ কারিগরি বিষয় পড়ে, কেউ শিখে বিজ্ঞান বা কলা। এসব দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার ভিতটা থাকে শক্তিশালী, মান থাকে উন্নত।
সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে আমাদের জীবনধারা। একটা সময় ছিল, বাবা-মায়ের কাছে শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ শেষে বিদ্যালয়ে পাঠানো হতো শিশুদের। এখন বাবার সঙ্গে মায়েরও ব্যস্ততা বেড়েছে। চাকরি, সামাজিক দায়িত্ব, সংসার গোছানোসহ নানা কিছুতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন আমাদের মায়েরা। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক মা তাদের সন্তানকে প্রাথমিক পাঠটুকুও দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এসব ক্ষেত্রে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্রও চালু করেছে। এটি প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বর্তমান সরকারের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
কোমলমতি শিশুরা হয় কচি মনের। বয়সের সঙ্গে তারা বুঝতে শিখে। চারিদিকে যা দেখে, তাই নতুন মনে হয়। বয়োবৃদ্ধির প্রারম্ভিকায় তারা আকৃষ্ট হয় রং-বৈচিত্র্যের প্রতি। পড়াশোনা আসলে কঠিন নিয়মের ধারাবাহিকতা। নিয়ম করে পড়তে বসা, ক্লাসে যাওয়া, বাসায় গিয়ে হোমওয়ার্ক করা প্রভৃতি কাজ কঠিনই বৈকি! নানা ছুঁতোয় স্কুলে না যাওয়ার প্রবণতা শিশুদের জন্য খুব স্বাভাবিক। এজন্য আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাকে চিত্তাকর্ষক ও আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। যেন দেখলেই ছুঁয়ে দিতে মন চায়, প্রথম দেখাতেই কাছের করে নিতে চায়, ভালো লাগা তৈরি হয়। একটি শিশুর সার্বিক বিকাশের সিংহভাগ নির্ভর করে বিদ্যালয়ের আনন্দঘন পরিবেশ, শিক্ষকের দক্ষতা ও শিখন-শেখানো কার্যক্রমের ওপর।
আমাদের দেশের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। দেশের সার্বিক অবস্থার বিবেচনায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় অনেকেই আগ্রহী হন না। তবে এ আগ্রহের ধরনে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের বেতন-কাঠামো আকর্ষণীয় ও সন্তোষজনক করা, নিয়োগ-প্রক্রিয়া সুষ্ঠু করা এবং শিক্ষক-প্রশিক্ষণের বর্তমান ধারার সংস্কার করা জরুরি। আশার কথা হলো, সরকার এ ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে যে কয়েকটি খুব ভালো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদটি দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীতকরণ এর অন্যতম উদাহরণ। এর ফলে এই শিক্ষকরা তুলনামূলক বেশি বেতন-ভাতাসহ সুবিধাদি পাচ্ছেন। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গুণগত শিক্ষার ধারা নিশ্চিত করতে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
শেখ হাসিনা সরকারের নানামুখী সময়োপযোগী পদক্ষেপের কারণে গত এক দশকে দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় বেশ অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এর শুরুটা হয়েছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরেই। ১৯৭৩ সালে ৩৬ হাজার ১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করে প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রযাত্রার শুভ সূচনা করেছিলেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে সরকারের গৃহীত আরো পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে তিন দফার প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি। এ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের প্রথমদিনেই রঙিন বই তুলে দেওয়া, উপবৃত্তি কার্যক্রম, সরকারি বিদ্যালয়ে দপ্তরি-কাম-প্রহরী নিয়োগ, স্টুডেন্টস কাউন্সিল গঠন প্রভৃতি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মানসিক বিকাশ ও খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট করতে শিক্ষার্থীদের জন্য বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নে্ছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টসহ ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে। শিক্ষকের নতুন পদ সৃষ্টিসহ বিপুল সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ, প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালু, পুল শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগও প্রশংসনীয়। প্রাথমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়ে ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রমও শুরু হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে। গমনোপযোগী প্রায় শতভাগ শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি, শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সমতা আনা, নতুন শিক্ষাক্রমে নতুন পাঠ্যবই, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা চালু, অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়েছে।
প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী দেশের সব শিশুকে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে স্কুল মিল নীতির আওতায় নিয়ে আসতে অতি সম্প্রতি ‘জাতীয় স্কুল মিল নীতি ২০১৯’-এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। শিক্ষার্থীদের রান্না করার খাবার, বিস্কুট, ডিম অথবা কলা খাওয়ানোর ব্যবস্থা রেখে এই নীতির খসড়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৩০ লাখ শিক্ষার্থী এর আওতায় রয়েছে। সবাইকে যুক্ত করলে ১ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থী এর আওতায় আসবে।
দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গুণগত শিক্ষার ধারা নিশ্চিত করতে এটি বর্তমান সরকারের আরো একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর ফলে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যহারে কমে আসবে। এ কার্যক্রম শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিসহ গ্রাম ও শহর, ধনী ও গরিবের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে শিক্ষার মানের ব্যবধান কমাতে সাহায্য করবে। শিক্ষার্থীদের মেধার উত্কর্ষ সাধন, চিন্তা ও কল্পনাশক্তির বিকাশ, সৃজনশীলতা এবং দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদে পরিণত হতে ভূমিকা রাখবে। এটি কার্যকর হলে প্রাথমিক স্তরের সব শিক্ষার্থীকে স্কুলে ভর্তি, উপস্থিতির হার বৃদ্ধি, পাঠে মনোনিবেশ, পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় যথার্থ অবদান রাখবে। এটি শেখ হাসিনা সরকারের ভবিষ্যত্ শিশুদের প্রতি বিনিয়োগও বলা চলে।
আমাদের দেশে প্রাথমিকে মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের পথে প্রধান বাধা হচ্ছে ক্ষুধা ও অপুষ্টি। পেটে ক্ষুধা নিয়ে একটি শিশু কখনো পড়াশোনায় ভালোভাবে মনোযোগ দিতে পারে না। ‘জাতীয় স্কুল মিল নীতি-২০১৯’ নীতিমালা অনুযায়ী, ৩ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় শক্তির চাহিদার ন্যূনতম ৩০ শতাংশ স্কুল মিল থেকে আসা নিশ্চিত করা হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীকে সপ্তাহে পাঁচ দিন রান্নাকরা খাবার এবং একদিন উচ্চপুষ্টিমান সম্পন্ন বিস্কুট সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি মানসিক বিকাশ দ্রুত হবে।
বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে দেশের ১০৪টি উপজেলার ১৫ হাজার ৩৪৯টি বিদ্যালয়ে এই খাবার দেওয়া হচ্ছে। আর দেশের তিনটি উপজেলায় রান্নাকরা খাবার দেওয়া হচ্ছে। যেসব স্কুলে রান্নাকরা খাবার দেওয়া হচ্ছে সেখানে উপস্থিতির হার বেড়েছে ১১ শতাংশ আর শুকনো খাবার (বিস্কুট) দেওয়া স্কুলগুলোতে বেড়েছে ৬ শতাংশ। শিক্ষার্থীদের রক্তস্বল্পতার হার কমেছে যথাক্রমে ১৬ দশমিক ৭ ও ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এসব স্কুলের শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারও কমেছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর পরিচালিত বার্ষিক প্রাথমিক স্কুল জরিপের তথ্যানুযায়ী, ২০০৫ সালে ঝরে পড়ার হার ছিল ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ, ২০০৬ সালে ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ, ২০০৭ সালে ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ, ২০১০ সালে ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০১২ সালে ২৬ দশমিক ২ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১৮ সালে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এসব জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, গত এক দশকে দেশের প্রাথমিকে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার অর্ধেকেরও বেশি কমে এসেছে। মূলত শেখ হাসিনা সরকারের সময়োপযোগী নানা পদক্ষেপের কারণে এই সাফল্য এসে ধরা দিয়েছে। সমৃদ্ধ ও উন্নত আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে চায় সরকার। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে শেখ হাসিনা সরকারের গৃহীত উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপসমূহের মধ্যে রয়েছে- বছরের শুরুতে প্রতিটি স্কুলে ক্যাচমেন্ট এলাকাভিত্তিক শিশু জরিপপূর্বক ভর্তি নিশ্চিত করা, নিয়মিত মা সমাবেশ, উঠান বৈঠক ও হোম ভিজিট কার্যক্রম, বছরের প্রথম দিন শতভাগ শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে বই বিতরণ, স্কুল ফিডিং কার্যক্রম গ্রহণ, রূপালী ব্যাংক শিওর ক্যাশের মাধ্যমে শতভাগ শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি প্রদান, একীভূত শিক্ষা কার্যক্রম চালু, প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালু করা ও উপকরণ সরবরাহ, স্থানীয় জনগণকে বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা এবং আনন্দ স্কুল প্রতিষ্ঠা করা। দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বর্তমান সরকারের এ সকল উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে।
n লেখক: সাবেক সদস্য, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন, সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
