গত কয়েকদিন ধরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো রেইন ফরেস্ট আমাজনে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। আগুনের শিখা পুড়িয়ে সাফ করে দিচ্ছে সমস্ত গাছপালা এবং আমাজনের জীববৈচিত্র্যকে। আমাজন হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো চিরহরিত্ বনাঞ্চল। এই বনে গাছ রয়েছে প্রায় ১৬ হাজার প্রজাতির। আর গাছের সংখ্যা কত হাজার কোটি হবে তা সঠিকভাবে কেউ বলতে পারবে না। আমাজন হলো আমাদের এই গ্রহের ফুসফুস। কারণ মানুষসহ সকল প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য যে অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় তার ২০ শতাংশ সরবরাহ করে আমাজন। গাছপালা অক্সিজেন সরবরাহ করা ছাড়াও আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে। তা হলো, আমাদের নিঃশ্বাসের সঙ্গে ছেড়ে দেওয়া কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে পরিবেশকে উষ্ণতার হাত থেকে রক্ষা করে। পৃথিবীর অকৃত্রিম বন্ধু আমাজনের এই করুণ পরিণতি দেখে তাই আমরা নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকতে পারছি না। আমাদের হূদয় বারবার গভীর দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছে।
আমাজন বনাঞ্চলে চলতি বছর রেকর্ড সংখ্যক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা দ্যা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্চের (ইনপে) এক প্রতিবেদনে জানা যায়, গত আট মাসে আমাজনে প্রায় ৭২ হাজার বারের বেশি আগুন লেগেছে। এই রেকর্ড অগ্নিকাণ্ডকে ‘আন্তর্জাতিক সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রেঁ। তিনি এক টুইটার বার্তায় লিখেছেন, ‘আমাদের ঘর জ্বলছে।’ ফরাসি প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য নিয়ে একটু ভাবার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি। আমরা যারা বাংলাদেশে বসে মনে করছি, সেই কোন্ সুদূর ব্রাজিলের বনে আগুন লেগেছে তাতে আমাদের কী! কিন্তু বিষয়টা মোটেও তেমন নয়। অক্সিজেন ছাড়া কোনো মানুষ কিংবা প্রাণীর পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। আর জীবন রক্ষার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় এই উপাদান আমরা একমাত্র গাছের কাছ থেকেই পেতে পারি। আর অক্সিজেন উপাদানের ক্ষেত্রে আমাজন পৃথিবীর বনাঞ্চলগুলোর মধ্যে সবার ওপরে রয়েছে। সুতরাং আমরা কীভাবে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকতে পারি?
ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা আমাদের আরো জানাচ্ছে, ২০১৮ সালে আমাজন থেকে ৭৫ হাজার কিলোমিটার বনাঞ্চল হারিয়েছে। এই পরিমাণ ২০১৭ সালের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি। শুধু গত আট মাসে ২২০০ কিলোমিটার বনাঞ্চল উজাড় হয়ে গেছে। এখন একটু চিন্তা করে দেখুন, যেভাবে দিনের পর দিন আমাজন হারিয়ে যাচ্ছে তাতে এক সময় সম্পূর্ণ বন উজাড় হয়ে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করা এবং এখানে মানব বসতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য বনাঞ্চলের গুরুত্বকে আমরা কখনো অস্বীকার করতে পারি না। বরং বিভিন্ন দেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে গাছ লাগিয়ে দেশকে সবুজে ছেয়ে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারপরও গাছ কেটে বনভূমি উজাড় করে দেওয়া থেমে নেই। আমাজন বনাঞ্চল নিয়ে রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে মনে করে থাকেন অনেকে। আমাজন নিয়ে তথ্য প্রকাশ করার জন্য মহাকাশ গবেষণা সংস্থার একজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে সংবাদ মারফতে জানতে পারছি। সুতরাং এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমাজন ধ্বংস হচ্ছে বহুদিন ধরেই। কিন্তু সেই ধ্বংসকে থামানোর জন্য কার্যকর কোনো উদ্যোগ আমাদের চোখে পড়েনি। বরং পূর্বের যে-কোনো সময়ের চেয়ে আমাজন এখন অধিকমাত্রায় ধ্বংস হয়ে চলেছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বনভূমিতে আগুন লেগে পুড়ে যাওয়া নতুন কোনো বিষয় নয়। নানান সময়ে আমরা দেখেছি, আগুনে পুড়ে সাফ হয়ে যাচ্ছে গাছপালা। এই দাবানলের ফলে শুধু যে মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাই নয়, বনের বিভিন্ন প্রাণীও ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়ে যায়। তাদের বেঁচে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়ে। দিনদিন পৃথিবীর উষ্ণতা ভয়াবহভাবে বেড়ে চলেছে। মানুষের খামখেয়ালি আচরণ এক্ষেত্রে কম দায়ী নয়। আমরা বিনা কারণে বনভূমি কেটে উজাড় করি। নিজেদের প্রয়োজনের কথা ভুলে গাছের গোড়ায় কুঠারের আঘাত করতে আমাদের একটুও বুক কাঁপে না। একদিকে শিল্পায়নের নামে দেশে দেশে বিভিন্ন কলকারখানা স্থাপন করে কার্বন নিঃসরণ অব্যাহত রেখেছি; অপরদিকে গাছপালা কেটে সাফ করে ফেলছি বনভূমি। ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা বেড়ে চলেছে দিনের পর দিন। মানুষ ভয়াবহভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হতে চলেছে। অথচ কেউ ভাবতেও পারছি না আমরা পৃথিবীকে ঠিক কোন্ দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছি।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আমাজনের পুড়ে যাওয়া দেখে বলেছেন, ‘বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের মধ্যে আমরা অক্সিজেন ও জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান উেসর এমন ক্ষতি মেনে নিতে পারি না। আমাজনকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে।’ আমরা জাতিসংঘ মহাসচিবের বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হয়ে বলতে চাই, আমাজনকে রক্ষা করার কোনো বিকল্প নেই।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
