বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১৬৫ দেশে অবস্থান করছেন বাংলাদেশি প্রবাসীরা। সরকারি হিসেবমতে তাদের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১১ লাখ। তবে বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে ১ কোটি ২০ লাখের কিছু বেশিতে। এই বিপুল সংখ্যক প্রবাসী যে আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ ও গতিশীল রাখছে তা আমরা অকপটেই স্বীকার করে নেই। কিন্তু প্রবাসীদের সামাজিক নিরাপত্তা প্রদানে আমরা কতটুকু দায়িত্বশীল?
পৃথিবীর মধ্যে আমাদের দেশের প্রবাসীদের সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ করে বিদেশ গমন করতে হয়, আর এই বিদেশ গমন প্রক্রিয়ার ৯৪ শতাংশ কাজ হয়ে থাকে দালালের মাধ্যমে। তাই দালালের হাত ধরে প্রতারণার ঘটনাও কম নয়। কিন্তু এই দালালদের বাদ দিয়ে অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পাদন বেশ কষ্টসাধ্য, কিন্তু এই দালালদের অভিবাসী সহযোগী হিসেবে মনে করে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে বা স্থানীয় সরকারের স্বচ্ছ নজরদারির আওতায় আনলে অভিবাসন প্রক্রিয়া নিরাপদ হবে। এতে করে দালালদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে সেই সঙ্গে প্রতারণার সুযোগ কম থাকবে। আমাদের সমাজে বিদেশ যাওয়ার পূর্বে পরিবারগুলো বিদেশ গমনের বিষয় গোপন রাখে, এমনকি অনেকে খোঁজ নেয় না যে সে কি কাজ করবে বা সেখানকার বেতন কত হবে। ফলে দেখা যায় সাত/আট লাখ টাকা খরচ করে বিদেশ যাচ্ছে কিন্তু বেতন পাচ্ছে মাত্র ১০/১৫ হাজার। একারণে বিদেশ যাওয়ার পূর্বে সকল তথ্য জেনে-শুনে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে বিদেশে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের প্রতি শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের ঘটনা আমাদের চোখে পড়ে। এপর্যন্ত ৭০০০ নারী শ্রমিক এ ধরনের নির্যাতনের ভুক্তভোগী হতে হয়েছে। আনুপাতিক হারে এর সংখ্যা কম হলেও প্রবাসে একজন বাংলাদেশি নারীর মর্যাদাহানি আমাদের জন্যে লজ্জাকর বিষয়। প্রবাসী নারী শ্রমিকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের নিয়মিত যোগাযোগ রাখার জন্যে কার্যকরী হট লাইন চালু করা সময়ের দাবি। একারণ এ দূতাবাসের কর্মকর্তা বা সেবা প্রদানকারীদের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে প্রবাসীদের ভূমিকা অস্বীকার করার অবকাশ নেই। প্রবাসীরা দেশের জাতীয় আয়ের মধ্যে ৬.৭ শতাংশ যোগানদাতা। তবে দেশের জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ অনেক সীমিত, অনেকক্ষেত্রে তা অসম্ভবও বটে। কারণ নির্বাচনের সময়ে তারা দেশে উপস্থিত থাকেন না। কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশ তাদের অভিবাসী নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করেছে। অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রবাসীদের রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দিতে হবে।
অভিবাসন একটি দেশের জন্যে রাজনৈতিক বিষয়, কেননা অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পাদিত হয় দেশগুলোর চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে। আমাদের দেশের অভিবাসন চুক্তির পাশাপাশি প্রবাসীদের বিদেশ গমন থেকে শুরু করে নিরাপদ অভিবাসন, প্রত্যাবাসন ও অভিবাসন পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার ব্যাপারে ভবিষ্যত্ সরকারের বেশ সজাগ নজর রাখলে একদিকে কমবে বেকারত্বের হার অন্যদিকে বাড়বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
