মাছের পাশাপাশি একইসঙ্গে চাষ করা সম্ভব মুক্তা। এই সুযোগ কাজে লাগাতে নীলফামারীর প্রত্যন্ত এলাকায় মাঠে নেমেছেন দুই যুবক। এরইমধ্যে সফলও হয়েছেন তারা। তাদের সফলতা দেখে এলাকার বেকার যুবকরাও ঝুঁকছেন এ পেশায়। উত্তরাঞ্চলের স্বাদু পানিতে মুক্তা চাষের দ্বার উন্মোচন করেছেন নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সেলিম আল মামুন বাবু ও জুলফিকার রহমান বাবলা। দুই উদ্যোগী যুবক নিজস্ব পুকুরে মাছ চাষের পাশাপাশি শুরু করেছেন মুক্তার চাষ। পরীক্ষামূলক প্রকল্প হলেও এরইমধ্যে মুক্তা আহরণে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছেছেন তারা।
নিজ বাড়ির পাশে বাবুর রয়েছে ৫৭ শতকের জলাশয়ে মাছ চাষের প্রকল্প। তেমনি বাবলারও রয়েছে ৯০ শতক জমিতে মাছ চাষের প্রকল্প। তারা দীর্ষদিন ধরে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করছিলেন। এরইমধ্যে মাছের পুকুরেই মুক্তা চাষের সম্ভাবনার কথা চিন্তা করেন তারা। দু’জন ২০১৮ সালের মাঝামাঝি মুক্তা চাষের প্রশিক্ষণ নেন বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বিএফআরআই)। প্রশিক্ষণ শেষ করার পর থেকেই পুরোদমে কাজে নেমে পড়েন তারা। ১ বছরেই ঝিনুক থেকে মুক্তা আহরণ শুরু করেছেন সফল দুই উদ্যোক্তা। তারা প্রতি শতক জমিতে ৬০ থেকে ৭০টি ঝিনুকে মুক্তা উত্পাদনে সক্ষম হয়েছেন। এখানে প্রতিটি দেশি ঝিনুকে একটি করে মুক্তা উত্পাদন করা হয়েছে।
তারা জানান, মুক্তা চাষের জন্য প্রয়োজন কিছু সরঞ্জাম। এসব সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে ঝিনুক অপারেশনের কিটবক্স, দুই ধরনের নেট বক্স ও ইমেজ তৈরির জন্য কিছু যন্ত্রপাতি। সাধারণত ১৮ থেকে ২০ মাস বয়সে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ইমেজটি স্থাপন করা হয় ঝিনুকের পেটে। এরপর দুই থেকে আড়াই ফুট পানির নিচে ডুবিয়ে রাখা হয় ঝিনুকগুলোকে। এভাবে ২১ থেকে ২৮ দিন রাখার পর সেগুলোকে উন্মুক্ত করা হয় পুকুরে। এরপর ৮ থেকে ১০ মাসের মধ্যে স্থাপিত ইমেজটি মুক্তায় পরিণত হয়। সবশেষে পুকুর থেকে ঝিনুক থেকে আহরণ করা হয় মুক্তা।
ঝিনুক সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রতিটি মুক্তা আহরণ পর্যন্ত খরচ হয় ২০ থেকে ২৫ টাকা। আর প্রতিটি প্রমাণ সাইজের ঝিনুকের বাজার মূল্য প্রায় ৫ হাজার টাকা।
জুলফিকার রহমান বাবলা বলেন, ‘প্রায় ১২ বছর আগে জেনেছিলাম মুক্তা চাষ করা যায়। কিভাবে এবং কোথায় করা যায় সেটা জানতাম না। ২০১৮ সালের জুন মাসে মাছ চাষের প্রশিক্ষণের জন্য ময়মনসিংহে বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বিএফআরআই) যাই। সেখানে স্বাদু পানিতে মুক্তা চাষের প্রশিক্ষণের খবর পেয়ে জুলাই মাসে তিনদিনের প্রশিক্ষণ নিই। এরপর থেকে স্থানীয়ভাবে ঝিনুক ও অন্যান্য সরঞ্জাম সংগ্রহ করে মুক্তা চাষে নেমে পড়ি।’ ৫০ হাজার ঝিনুক সংগ্রহ করে পুকুরে ছাড়েন বাবলা। সেখান থেকে ৬০০টি ঝিনুকে মুক্তা চাষে সফল হয়েছেন তিনি।
উদ্যোক্তারা জানান, উত্তরবঙ্গের স্বাদু পানিতে মুক্তা চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এর ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়লে অনেক নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘আমাদের দেশের জলবায়ু মুক্তা চাষ উপযোগী। বাংলাদেশের শীতকাল দীর্ঘ নয় এবং সারাবছরই উষ্ণ আবহাওয়া বিদ্যমান থাকায় তা ঝিনুক বৃদ্ধি ও মুক্তা চাষের অনুকূল। আমাদের দেশে জলাভূমিতে মাছ চাষের সঙ্গে মুক্তা চাষ সম্ভব। মুক্তা চাষ ব্যয়বহুল কিংবা কঠিন নয়।’
এ বিষয়ে বিএফআরআইয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ফেরদৌস সিদ্দিকী বলেন, ‘বাংলাদেশে দেরিতে হলেও ২০১২ সালের দিকে স্বাদু পানিতে মুক্তা চাষের একটি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। যেহেতু আমাদের দেশে প্রাকৃতিকভাবে ঝিনুক পাওয়া যায় এবং তাপমাত্রা ১০ মাস উষ্ণ থাকে সেদিক থেকে মুক্তা চাষের জন্য তা খুবই উপযোগী। ইউরোপিয়ান দেশ বলেন, প্রাচ্যের দেশ বলেন সবখানেই মুক্তার ব্যবহার রয়েছে। শুধু অলঙ্কারে নয়, চিকিত্সাশাস্ত্রেও ব্যবহূত হচ্ছে মুক্তা। আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরিতে, রূপচর্চার কাজেও মুক্তা ব্যবহূত হচ্ছে। বিএফআরআই থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মধ্যে ৮ থেকে ১০ জন সফলভাবে প্রথম পর্যায়ে মুক্তা উত্পাদন করেছেন। সেটির বাজার সৃষ্টির জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘দেশের বাইরে চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও ইমেজ মুক্তার ডিমান্ড রয়েছে। আমাদের দেশেও অভিজাত শ্রেণি দাম দিয়ে মুক্তা কিনছেন। জুয়েলারি দোকানে মুক্তা বিক্রি হচ্ছে। ফার্মারদের সঙ্গে বায়ারদের যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। সরকার এ বিষয়ে এগিয়ে এলে কৃষক উপকৃত হবে, দেশ এগিয়ে যাবে এবং নতুন একটি শিল্পের বিকাশ ঘটবে।’
