বর্ষাকাল এলে মন ছুটে যায় চলনবিলের পানে। এ মৌসুমে চলনবিলের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য অবলোকন না করলে মন যেন অতৃপ্ত থাকে। চলনবিলের অথৈ জলে ঢেউয়ের আঁচড়ে পড়ার দৃশ্য, দ্বীপের মতো জেগে থাকা ছোট ছোট গ্রাম, নৌকায় ভেসে ভেসে জেলেদের মাছ আহরণ, নৌকাযোগে পর্যটকদের ছুটে চলা ও মাছ-পাখিদের মিতালী দেখতে চলনবিলে ছুটে গিয়েছিলাম গত ১৬ আগস্ট। দিনটি সত্যিই চমত্কার ছিল। সকাল ১০টা নাগাদ বাড়ি থেকে একদল ভাইবোন বেরিয়ে পড়ি। চলনবিলে ভ্রমণের জন্য স্যালো-ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়ায় পাওয়া যায়। একটি নৌকা নিয়ে আমাদের ছুটে চলা শুরু হয় চলনবিলের পানে।
দেশের বৃহত্তম বিল হিসেবে চলনবিল সুপরিচিতি লাভ করেছে। বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই চলনবিলে ভ্রমণপিপাসুদের ঢল নামে। উত্সুক পর্যটকরা ভাবেন, কবে আসবে বর্ষাকাল! আমরা সে সুযোগটা এবার কাজে লাগাতে পেরেছি ঈদের ছুটি থাকার কারণে। চলনবিলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হচ্ছে নাটোরের সিংড়া উপজেলার পূর্ব-দক্ষিণ অংশ। মোট ৯টি উপজেলার ছোট বড় বিলের সমন্বয়ে চলনবিল গঠিত হলেও চলনবিলের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য স্থান পর্যটকদের বেশি আকৃষ্ট করে। শুধুমাত্র প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগের জন্য হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসে চলনবিলে। আমাদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
বাংলাদেশের অন্যান্য বিল থেকে এ বিলের পার্থক্য হলো এটি খরস্রোতা। চলন নামানুসারেই এটির নামকরণ হয়েছে চলনবিল। কচুরিপানার সঙ্গে গৃহিণীর হাঁস ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে চলনবিল। পাবনা, নাটোর, সিরাজগঞ্জ জেলার অংশজুড়ে এ বিলের বিস্তৃতি হলেও নাটোরের চলনবিল নামে সমধিক খ্যাত। বর্ষা মৌসুমে অসংখ্য নদী, খাল দিয়ে এ বিলে পানি প্রবেশ করে। আত্রাই তার মধ্যে অন্যতম। বর্ষাকালে জলরাশির বুকে নৌকায় পাল তুলে ঘুরতে মন কার না চায়। তাই তো বর্ষা এলেই চলনবিল হয়ে ওঠে পর্যটনের এক অনবদ্য স্থান। পর্যটক হিসেবে আমরা ছুটে যাই। চলনবিল নিয়ে স্থানীয়দের প্রত্যাশার শেষ নেই। বর্ষা মৌসুমে অনেকের জীবিকার মাধ্যম হয়ে ওঠে এই চলনবিল। তাই অনেকেই দাবি করছেন চলনবিলকে পর্যটন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হোক।
সিংড়া পয়েন্ট অংশ
বর্তমানে চলনবিলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান হয়ে উঠেছে সিংড়া পয়েন্ট এলাকা। সিংড়া উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে এটি অবস্থিত। এখান থেকেই শুরু হয় ডুবন্ত সড়ক। কংক্রিটের অনবদ্য কারুকার্যে নির্মিত ডুবন্ত সড়কটি চলে গেছে সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলার দিকে। বর্ষায় প্রায় ১৭ কিলোমিটারের এ সড়ক দিয়ে যেমন মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, অটোরিকশাসহ ছোট-বড় যানবাহন চলাচল করে তেমনি ডুবন্ত রাস্তার ওপর দিয়ে নৌকা চলে যায়। বোঝার উপায় নেই যে, এদিক দিয়ে রাস্তা বয়ে গেছে। এটি সত্যিই মনোমুগ্ধকর। এই ডুবন্ত রাস্তায় পর্যটকরা পা ভেজায়, হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় যতদূর মন চায়। কেউ কেউ পানিতে নেমে গোসল করে। তাছাড়া চলনবিলের সিংড়ায় পয়েন্ট অংশে পর্যটকদের চাহিদা মেটাতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ‘চলনবিল পর্যটন পার্ক’। এই পার্কে শিশুদের জন্য রয়েছে দোলনা, ফুলের বাগান, রাইডিং। চলনবিলের মাঝে গড়ে ওঠা ‘চলনবিল পর্যটন পার্ক’ পর্যটকদের ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। ৩০ টাকা প্রবেশ মূল্যে এর ভেতরের পরিবেশ যেমন উপভোগ করা যায় তেমনি চলনবিলকে অতি কাছ থেকে দেখা যায়।
তিসিখালি মাজার অংশ
চলনবিলের আরেকটি দর্শনীয় ও ঐতিহ্যবাহী স্থান হলো হযরত ঘাসি দেওয়ান (রহঃ)-এর মাজার শরীফ। এটি ‘চলনবিলের তিসিখালি মাজার’ নামে সমধিক পরিচিত। এটি নিয়ে নানাবিধ জনশ্রুতি রয়েছে। প্রতিবছর চৈত্র চাঁন্দে মেলা বসে। মাজার প্রাঙ্গণে পাথরে খোদাই করে এসব তথ্য লেখা রয়েছে। পর্যটকরা অনায়সে চলনবিলের মাজারের উত্পত্তি, বিকাশ ও ইতিহাস জানতে পারেন। বর্ষায় যখন চারদিকে পানি আর পানি তখন দ্বীপের মতো জেগে থাকে এই মাজারটি। মাজারের চারদিকে সারিসারি নৌকা বাঁধা থাকে। দূর থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই সেখানে কোনো মাজার রয়েছে, মনে হবে যেন নৌকার হাট। অবসর পেলেই মানুষ ছুটে আসে এখানে। বিশেষ করে শুক্রবারে দর্শনার্থীদের আগমনে মুখরিত হয়ে ওঠে মাজার প্রাঙ্গণ। প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাউলদের গানের আসর বসে। চলনবিল ভ্রমণে এসে এখানে না এলে যেন অনেককিছু বাদ পড়ে যায়।
বিলসা ব্রিজ অংশ
চলনবিল বর্তমানে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে ডুবন্ত রাস্তার জন্য। গুরুদাসপুর উপজেলার বিলসা নামক স্থানে পর্যটকদের একটি অংশ সময় কাটান। বিলসার চারদিকে পানি আর পানি। আশেপাশে জনপদ না থাকলেও বিলসা একটি গ্রাম। একটি ব্রিজ এই স্থানকে উপজেলার সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছে। দ্বীপের মতো এ জায়গায় বসতি, ঈদগাহ মাঠ, মসজিদ ও করবস্থান রয়েছে। পর্যটকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে কৃত্রিম দ্বীপ। যার নামকরণ করা হয়েছে ‘স্বর্ণদ্বীপ’। এই দ্বীপে রয়েছে কফি হাউজ। এক কাপ কপি খেতে খেতে চলনবিলের অথৈ জলের ঢেউ দেখে নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পাওয়া যাবে এখানে। বাঁশের সাঁকোতে দাঁড়িয়ে দেখা যায় ডুবন্ত রাস্তায় নেমে পর্যটকদের পানির সঙ্গে মিতালীর দৃশ্য। স্বর্ণদ্বীপের ঘাটে এসে ভিড়ে স্পিডবোর্ড। জনপ্রতি ৫০ টাকা করে ভাড়ায় নিমিষে ঘুরে আসা যায় বিলসা ব্রিজের অংশবিশেষ। এখান থেকে আরেকটু এগিয়ে গেলেই দেখা মেলে কোন্দল ব্রিজ এলাকা। এখানে পর্যটকরা রান্নার আয়োজন করেন। নৌকা ভিড়িয়ে রাত্রিযাপন করেন।
সেদিন যখন চলনবিল নৌকাযোগে ভ্রমণ করছিলাম তখন নিজেকে খুবই গর্বিত মনে হচ্ছিল এই ভেবে যে, আমি চলনবিলের মানুষ। কত মানুষ আমাদের প্রাণের চলনবিল দেখতে ছুটে আসেন। আমাদের সমুদ্র দেখতে বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না। চলনবিলই যেন সমুদ্রের আমেজ বয়ে এনেছে। আকাশে সেদিন মেঘের ঘনঘটা ছিল। বৃষ্টিও পড়ছিল। চলনবিলের উত্তাল বাতাসে ছুটে চলছিল নৌকা। বিলের পানির পরশে শুষ্ক শরীর যেন প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছিল।
চলনবিল ভ্রমণের উপায়
বর্তমানে সড়কপথ উন্নত হওয়ায় চলনবিল এলাকায় অনায়াসে ভ্রমণ করা যায়। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকেই নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জে সহজেই যাওয়া সম্ভব। রেলপথে যাওয়া আরো সহজ। চলনবিলে নৌকাভ্রমণ করতে হলে সিংড়া উপজেলা থেকে রিকশাযোগে সিংড়া পয়েন্ট এলাকায় যেতে হবে। সেখানে ভাড়ায় নৌকা পাওয়া যায়। ১০০০-১২০০ টাকায় সারাদিনের জন্য নৌকা রিজার্ভ করে সমগ্র চলনবিল ঘুরে দেখা সম্ভব। এছাড়া সিংড়া উপজেলার বিলদহর বাজার থেকে নৌকা ভাড়া নিয়ে সাবগাড়ী, হরদমা, জগিন্দ্রনগর নদী দিয়ে চলনবিলে প্রবেশ করা যায়। বিলসা অংশে ভ্রমণে গুরুদাসপুর থেকে ভ্রমণ শুরু করলে সহজ হবে। এছাড়া সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, পাবনার চাটমোহর দিয়েও চলনবিলে প্রবেশ করা সম্ভব। বৃহত্ বিলের পুরো অংশ একদিনে ঘুরে দেখা কষ্টসাধ্য। পুরো চলনবিল ঘুরে দেখতে দর্শনীয় স্থানগুলো আগে চিহ্নিত করে নিতে হবে এবং চলনবিলের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করতে অবশ্যই বর্ষাকালকে বেছে নিতে ভুলবেন না।
