পাথর, পানি, পাহাড় আর আকাশ নিয়েই যেন বিছানাকান্দি। এখানে আসার পর যে কথাটি সর্বপ্রথম মনে হয় তা হলো প্রশান্তি। এই প্রশান্তিটুকু নিমিষেই ভুলিয়ে দেয় প্রতিদিনের শত গ্লানি। বিছানাকান্দির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কাছে যেন হার মানতেই হয় নাগরিক সভ্যতাকে। আর এই চরম সত্যটুকু উপলব্ধি করতে হলে আপনাকে যেতে হবে বিছানাকান্দি।
বিছানাকান্দির আরেক নাম সাত পাহাড়ের মুখ। কারণ এখানে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে দেখা যায় মেঘালয় রাজ্যের ৭টি পাহাড়ের মুখ। স্বচ্ছ জলধারা পাহাড়ের গা বেয়ে ছোট-বড় পাথর ডিঙিয়ে এসে পড়ে পিয়াইন নদীতে। বাংলাদেশের শত কর্মব্যস্ততা, আকাশ, নদী, বাড়িঘর আর ফসলী জমিকে পেছনে ফেলে আপনি যতটা না এগিয়ে যাবেন শেষ সীমান্তের দর্শনে ততটা এগিয়ে আসবে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের হাতছানি। শিল্পীর তুলিতে আঁকা পাহাড়গুলো থেকে বেয়ে পড়া স্বচ্ছ পানির ঝরনা আপনাকে মুগ্ধ করবে আর দু-চোখে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেবে পাশাপাশি অবস্থান করা ৭টি পাহাড়।
সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত সীমান্ত এলাকা রোস্তমপুরই বিছানাকান্দি। হাদারপাড় বাজার থেকে বর্ষা মৌসুমে নৌকা আর শুষ্ক মৌসুমে হেঁটে যেতে হবে বিছানাকান্দি। দেশের যেকোনো স্থান থেকে আপনাকে প্রথমে যেতে হবে সিলেট শহরে। তারপর আম্বরখানা থেকে সিএনজি/মাইক্রো ভাড়া করে বিমানবন্দরের রাস্তা ধরে হাদারপাড় হাইস্কুলের মোড় হয়ে হাদারপাড় বাজারে যেতে হবে। এটিই সিলেট থেকে বিছানাকান্দি আসার মূল সড়ক। বর্তমানে এ রাস্তাটির অবস্থা এতই নাজুক যে, বলে শেষ করা যাবে না। তবে সিলেট-জাফলং সড়ক দিয়েও বিছানাকান্দি যাওয়া যায়। এ রাস্তাটি চলাচলের উপযোগী ও আরামদায়ক। এক্ষেত্রে আপনাকে গোয়ানঘাট বাইপাস নতুন বাস স্টেশন হয়ে হাদারপাড় হাইস্কুলের মোড়, অতঃপর হাদারপাড় বাজার। হাদারপাড় বাজার থেকে বর্ষা মৌসুমে ট্রলার দিয়ে পিয়াইন নদী হয়ে আপনাকে বিছনাকান্দি পৌঁছাতে হবে আর শুষ্ক মৌসুমে ট্রলারের পরিবর্তে মোটরসাইকেল এবং পা একমাত্র সম্বল।
তবে নৌকা করে বিছানাকান্দি যাওয়ার পুরো পথ অসম্ভব রোমাঞ্চকর। স্বচ্ছ আর ঠাণ্ডা পানি ঠেলে নৌকার এঁকেবেঁকে বয়ে চলা মনে এনে দেয় অদ্ভুত প্রশান্তি। তার ওপর বাড়তি পাওনা হিসেবে তো আছে আশেপাশের গগনচুম্বী পাহাড় আর মাথার ওপর শুভ্র শান্ত আকাশের আবরণ। পথ যত কমতে থাকে অস্পষ্ট পাহাড়গুলো স্পষ্ট নিরেট আকার নিতে থাকে আর তখন মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতে হয়। যেন কোনো শিল্পীর আঁকা ছবি, প্রতিটি খাঁজে রয়েছে অপার সৌন্দর্য আর নিখুঁত কারুকার্যের নিদর্শন। যাওয়া বা আসার পথে পিয়াইন নদীতে দেখা মিলবে পাথর উত্তোলনকারীদের। নদী থেকে পাথর উত্তোলন, নৌকা করে গন্তব্যে পৌঁছানো এক বাড়তি অভিজ্ঞতা। এমন করে চলতে চলতে কখন যে পথ শেষ হয়ে আসে তা বলা মুশকিল। কিন্তু পথ শেষ হলেও সৌন্দর্য শেষ হওয়ার উপায় নেই। কারণ তখন আপনি চলে এসেছেন অপরূপা বিছানাকান্দিতে।
পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে এই ভাবনাটুকু কখন যে তলিয়ে যাবে বুঝতেই পারবেন না। পা রাখতেই টের পাওয়া যাবে কেন বিছানাকান্দিতে আসা। স্বচ্ছ আর হিমশীতল পানির নিচে যেন শতশত পাথরের মেলা বসেছে। নানারঙের, নানা আকারের আর বিচিত্র সব পাথরে ভরপুর এই জায়গাটিকে পাথরের রাজ্য বললে ভুল হবে না। শুধু পা ভিজিয়ে ক্ষান্ত থাকেন না এখানে আসা পর্যটকরা। শরীর এলিয়ে দিয়ে যখন চোখ বুজে আসে তখন একে পাথর বিছানো বিছনাই মনে হবে। বর্ষার সময় পানিতে টইটুম্বুর থাকে বিছানাকান্দি আর তখন একে তুলনা করা যায় সবে কৈশোর ছেড়ে যৌবনে পা দেওয়া তরুণীর সঙ্গে। অপরূপ চোখ জুড়ানো এক মোহনীয়তা যেন আবিষ্ট করে রাখে এখানে আসা পর্যটকদের। তাই সময় করে ঘুরে আসতে পারেন স্বচ্ছ জল আর পাথর পাহাড়ের বিছানাকান্দি।
সাবধানতা
মেঘালয়ের পাহার থেকে বেয়ে আসা স্বচ্ছ পানির জলধারা আপনাকে কাছে টেনে নেবে, তবে এখানে কোনো সীমানা প্রাচীর না থাকায় আপনাকে বাংলাদেশের সীমানার মধ্য থেকেই সবকিছু উপভোগ করতে হবে। তবে হাটের দিন যদি আপনার ভ্রমণ হয় তাহলে খুব সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে এবং অবৈধ পণ্য বহন থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে।
