উচ্চশিক্ষা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার এবং বাংলাদেশে শিক্ষার হার যেমন বাড়ছে তেমনি উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাড়ছে শিক্ষার্থীদের ভর্তির প্রবণতা। প্রতি বছর বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৪ লাখ শিক্ষার্থী এইচএসসি পাশের পর স্বপ্ন দেখে পাবলিক বা দেশের প্রায় ৪৬টি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার। আদাজল না খেয়ে নামলে যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগ মিলে না সেটা সবারই জানা। প্রায় ২ থেকে ৪ লাখ শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ বা সাবজেক্টে ভর্তির জন্য লড়াইয়ে নামে। কিন্তু এই যুদ্ধে বাধ সাধে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছু সেকেলে নিয়ম-কানুনের জন্য।
ভর্তিযুদ্ধ নামক এই যুদ্ধে নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে দেশের প্রায় সব শ্রেণির পরিবারের এবং গ্রাম-শহরসহ সব এলাকার শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদে আবেদন করে। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদের জন্য ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা আবেদন ফি পরিশোধ করতে হয়। এভাবে অন্তত ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি ১০টি অনুষদের জন্য কেউ আবেদন করতে চায় তাহলে যে টাকার অঙ্ক আসে সেটা পরিশোধ করা নিম্ন, নিম্নমধ্যবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষেও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু সমন্বিত পরীক্ষা হলে হয়তো অতিরিক্ত অর্থ খরচের হাত থেকে শিক্ষার্থী ও পরিবার উভয়ই রেহাই পেত।
প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে দেশের প্রায় সব এলাকার শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে নিজের যোগ্যতা ও মেধা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের জন্য একটি সিট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে চায়। কিন্তু সমস্যার সৃষ্টি হয় যখন দেখা যায় একটি নির্দিষ্ট সময়েই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। আজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা, কালই আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং তার কয়েকদিন পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা। এছাড়াও দুটি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের দুই প্রান্তে কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। স্বভাবতই যাতায়াত সমস্যার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও যে-কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিতে হয়। ফলে স্বভাবতই ভর্তিযুদ্ধে চান্স নামক সোনার হরিণের সম্ভাবনা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমে যায়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের যে একটা দীর্ঘ ভোগান্তি সেটাও লাঘব হয়। আবার ভর্তি পরীক্ষাগুলো একই সময়ে হওয়ার জন্য ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও থাকা-খাওয়া বাবদ অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়। নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে খরচটা একটা অতিরিক্ত বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। অর্থের অভাবে পরীক্ষা দিতে আসতে পারে না বা খুব কষ্টে অর্থ জোগাড় করে পরীক্ষা দিতে আসে এমন মেধাবী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। মেয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে দূর-দূরান্তে পরীক্ষা দিতে যাওয়া এখনো অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি। অনেক পরিবারই মেয়েদের দূরের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাওয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে শত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাদের একা একা পরীক্ষা দিতে যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। অথচ নিজ জেলায় যদি পরীক্ষা হতো অথবা অন্য জেলায় হলেও একদিন বা দুই দিনে পরীক্ষা শেষ হয়ে যেত তাহলে মেয়ে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পেত।
উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রথম ধাপে এতসব সমস্যার একটাই সমাধান সেটা হলো সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা। মেডিক্যাল কলেজগুলোতে যেভাবে ভর্তি পরীক্ষা হয় ঠিক একইভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য সমন্বিত পরীক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি সমন্বিত পরীক্ষা, স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা আলাদা অনুষদের জন্য সমন্বিত পরীক্ষা এবং মেধাক্রম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবজেক্টে ভর্তির সুযোগ করে দিলে দেশের ভর্তি-ইচ্ছুক কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর পাশাপাশি তাদের পরিবারের ভোগান্তিও হ্রাস পেত। মধ্যবিত্তের দেশে শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধার কথা চিন্তা করে কর্তব্যরত ব্যক্তিদের অতিদ্রুতই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা উচিত।
n লেখক :শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
