‘আরব বসন্তের ঢেউ :সিরিয়ার এক অতীত দুঃস্বপ্ন!’

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০১৯, ২১:২৭

তিউনিসিয়া, মিশর, বাহরাইন ও ইয়েমেন ‘আরব বসন্ত’ যখন একের পর এক সরকারের পতন ডেকে আনছিল, তখন সবার চোখ ছিল সিরিয়ার দিকে। অবশেষে আরব বসন্তের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল সিরিয়া ভূ-খণ্ডে। আরব বসন্তের নবজাগরণ যখন তুঙ্গে, তখন ২০১১ সালের ১৫ মার্চ সিরিয়ায় সরকার বিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এ আন্দোলন দমন করতে আসাদ সরকার কঠিন অবস্থানে যায়। ফলে তখন অত্যন্ত নাটকীয় ভঙ্গিতে উত্থান হয় জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএসের। এক পর্যায়ে আইএসের জঙ্গিরা ইরাক ও সিরিয়ার একটি অংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠা করে জঙ্গি রাষ্ট্র, যেখান থেকে তারা সমগ্র মুসলিম বিশ্বে খেলাফতের ডাক দেয়। আর তাতেই বিভ্রান্ত হন মুসলিম বিশ্বের হাজার হাজার মানুষ এবং দলে দলে মানুষ তথাকথিত ‘জিহাদি যুদ্ধে’ অংশ নিতে সিরিয়ায় যান।

তবে সিরিয়ায় আরব বসন্তের ঢেউ প্রবাহিত হওয়ার কারণ হিসেবে বলা যায়, অতীতে ও বর্তমানে সরকার পরিবর্তনের কোনো ক্ষমতা নেই সিরিয়ার জনগণের। দেশটি তাই কার্যত একটি একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সিরিয়ার প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হাফিয আল-আসাদ পাঁচবার গণভোটে বিজয়ের মাধ্যমে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখেন। তার ছেলে ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি বাশার আল-আসাদও ২০০০ সালের এক গণভোটে সিরিয়ার রাষ্ট্রপতি পদে বহাল হন। রাষ্ট্রপতি ও তার মূল সহযোগীরাই, বিশেষত সামরিক ও নিরাপত্তাবাহিনীর লোকেরা, সিরিয়ার রাজনীতি ও অর্থনীতির মূল সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে থাকেন। যেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজপরিবারের উচ্চবিলাসিতা পরিলক্ষিত হতো। এরূপ বৈষম্য ও সরকারি দল দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশ্বপরাশক্তির সঙ্গে দহরম মহরমের পরিপ্রেক্ষিতে জাগরিত হয় সিরীয়রা। আরব বসন্তের বিপ্লবে অনুপ্রাণিত হয়ে জুলাই ২০১১ সালে সেনাবাহিনীর দলত্যাগী সৈন্যরা আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে ‘ফ্রি সিরিয়ান আর্মি’ নামক দল গঠন করে এবং সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ ইউনিটও গঠন শুরু করে। তখন থেকেই ক্ষমতাসীন দল ও নব্যগঠিত যুদ্ধ ইউনিটের মধ্যে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ।

জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা শান্তিচুক্তির মাধ্যমে সমঝোতা করার চেষ্টা করলেও বিশ্ব পরাশক্তিদের নিয়মিত পদচারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সিরিয়া সংকটের সঙ্গে জড়িত করেছে। তাই আপাতদৃষ্টিতে সিরিয়া সংকটের কোনো সমাধান হচ্ছে না। সিরিয়া গৃহযুদ্ধে প্রায় ৪ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, ঘরবাড়ি ছেড়েছে ১ কোটি মানুষ, কয়েক লাখ সিরীয় নাগরিক আশ্রয় নিয়েছে জার্মানিতে। নিষ্ঠুর মানবতার এক চরম সাক্ষী হয়েছে ইতিহাস। একের পর এক বোমা হামলা, সর্বত্র সর্বসময় গোলাগুলি, সিরীয়দের জীবনের অংশে পরিণত হয়েছে। সেখানে মানবতা আজ ভূলুণ্ঠিত, অপদস্থ—এটা নির্দ্বিধায় বলাই যায়।

সিরিয়ার আরেক  দুঃস্বপ্ন সে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ। যে সিরিয়া ছিল খাদ্যে ও উত্পাদিত পণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির একটি দেশ, যুদ্ধের কারণে আজ সেখানে খাদ্যের অভাব। বেকার সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। যেখানে যুদ্ধের আগে দৈনিক ৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল তেল উত্তোলন হতো আজ সেখানে ২০ হাজার ব্যারেল উত্তোলন হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে তত্কালীন সিরিয়ার অর্থনৈতিক মডেল আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। সিরিয়ার তেল, গ্যাস ও সুপেয় পানির ওপর লোভাতুর জাতির চোখ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন করছে প্রতিনিয়ত।

আরব বসন্তের নবজাগরণ ঢেউয়ের বিপরীত তরীতে দৃঢ়ভাবে টিকে থাকা বাশার আল-আসাদ সরকার বিশ্ব পরাশক্তির মুখাপেক্ষী। ক্ষমতার স্থায়িত্ব বজায় রাখতে এক অসমাপ্ত নিষ্ঠুর গৃহযুদ্ধে দেশকে জিম্মি করে পরাশক্তির ছত্রচ্ছায়া সিরিয়াকে কতটা নিরাপদ রাখে এটাই দেখার বিষয়। তবে আরব বসন্তের নবজাগরণের নিষ্ঠুর ঢেউ সিরিয়াকে যে ক্ষত-বিক্ষত করেছে—এটাই চরম সত্যি। যার ফলে প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর সিরিয়া আজ অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্যের নব্য-জাহান্নাম।

n লেখক :শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ, সাতক্ষীরা