গতকালের পরের অংশ
এখানে একই ভাবে Air (বাতাস) এবং জ্যামিতির দৃষ্টিকোণ থেকে তল বা Plane শব্দ দু’টি একত্রিত করা হয়েছে মাত্র। যাহোক, একদিনে তো উড়োজাহাজ আবিস্কৃত হয়নি। মানুষের অদম্য ইচ্ছে এবং নিরলস প্রচেষ্টার সারথি ধরে কালের পরিক্রমায় উড়োজাহাজ এখনকার পর্যায়ে এসেছে। আমরা হয়তো অনেকেই প্রখ্যাত শিল্পকর্ম ‘মোনালিসা’ বা ‘লাস্ট সাপার’ এর সূত্র ধরে ‘লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি’র কথা জানি। কিন্তু তাঁর আরেকটি যুগান্তকারী শিল্প কর্মের আওতায় উড়োজাহাজের কাল্পনিক স্কেচ। তিনিই প্রথম পরিকল্পনাকারী হিসেবে (পাখি এবং বাদুরের এনাটমি ভিত্তিক) স্কেচ প্রণয়ন করেন। আর রাইট ব্রাদার্স এই স্কেচের উপর ভিত্তি করে নাকি প্রথম উড়োজাহাজ আবিষ্কার করেছিলেন? কিন্তু এ ব্যাপারে বিজ্ঞানী মার্কনি কর্তৃক রেডিও আবিষ্কারের ন্যায় প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ রেডিও আবিষ্কারের আদি ভিত্তিমূলক ফরমূলা নাকি ভারতের ড. জগদীশ চন্দ্র বসু প্রণয়ন করেছিলেন। ঠিক সেই রকম আধুনিক উড়োজাহাজের আবিষ্কারক হিসেবে কৃতিত্ব পেয়েছেন আমেরিকার রাইট ব্রাদার্স। কিন্তু এই বিষয়টি ভারত উপমহাদেশের মানুষ মানতে রাজী নয়। অবশ্য এর পেছনে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য রয়েছে, যা বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হবে যে, প্রথম উড়োজাহাজ আবিষ্কারের কৃতিত্ব হলো ব্রিটিশ ভারত উপমহাদেশের আওতাধীন মহারাষ্ট্রের শিভকর বাপুজি তালপাড়ে। শিভকর ১৮৬৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একই ক্লাসে আটবার ফেল করলেও তাঁর প্রজ্ঞা ও কারিগরি জ্ঞান ছিল অভূতপূর্ব। আর তাঁর থাকার ঘর ছিল বিজ্ঞান গবেষণাগার। তিনিই প্রথম স্বনির্মিত উড়োজাহাজ নিয়ে বাতাসে ভর করে উড়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই আবিষ্কারটি সাদা চামড়ার ব্রিটিশরা ভালো চোখে দেখেনি। এই ব্রিটিশরা শিভকরকে তাঁর আবিষ্কারের গবেষণা পত্রটি বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে দেয়নি। বরং তাঁর গবেষণা পত্রটি কলা কৌশলে তারা (ব্রিটিশরা) হাত করেছিল। এখানেই শেষ নয়। শিভকরকে জানে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র হলে তিনি বলতে গেলে পালিয়ে প্রাণে রক্ষা পান। পরবর্তীতে যদিও পাশ্চাত্য বিশ্ব তাঁকে এ ব্যাপারে নাকি কৃতিত্ব দিয়েছিল। তাছাড়া কয়েক বছর আগে “নাসা” কর্তৃক একটি অনুষ্ঠানের আয়োজনপূর্বক সোয়া শত বছর আগে শিভকরের তৈরীকৃত মার্কারী চালিত উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের ডিজাইন পুনঃ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। আসলে এই বিষয়টি প্রহসনের মতো মনে হয়। বাবা বা জনক হলো একজন। অথচ পিতৃত্বের অধিকারী আরেকজন। যেভাবেই বলুন না কেন বিশ্ববাসী জানে যে প্রথম উড়োজাহাজের আবিষ্কারক হলো রাইট ব্রাদার্স। অবশ্য তাদের ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং প্রচেষ্টাও কম নয়? যাহোক যেটা মাথায় রেখে নিবন্ধনের স্বার্থে রাইট ব্রাদার্স সম্পর্কে সঙ্গতকারণেই তুলে ধরছি। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, উইলবার রাইট (জন্ম ১৮৬৭, ইন্ডিয়ানা) এবং অরভিল রাইটের (জন্ম ১৮৭১, ওহাইজ) বাবা গির্জার যাজক মিল্টন রাইট তাদের ছোটবেলায় একটি খেলনা হেলিকাপ্টার উপহার দিয়েছিলেন। তখন দু’ভাই এই খেলনা হেলিকাপ্টার নিয়ে মেতে উঠেন। বার বার ব্যবহারের ফলে খেলনাটি ভেঙ্গে গেলে দু’ভাই মিলে আবার অবিকল খেলনা তৈরী করে ফেলেন। এর থেকে দু’ভাইয়ের আকাশে উড়ার বাসনা চেপে বসে। আর এই ইচ্ছের বীজ মনো জগতে রোপন করে ফেলে এবং তারা এ ব্যাপারে স্বপ্ন দেখতে থাকেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি তাদের তেমন আগ্রহ ছিল না। তাদের মা সুসান ক্যাথেরাইন কোয়েরানা অসুস্থ থাকায় মাকে সেবা করতেন এবং যতটুকু সময় পেতেন বাবা’র লাইব্রেরীতে পড়াশুনাা করতেন। অবশ্য ছোট ভাই অরভিল বেশ পড়ুয়া ছিলেন। একদিকে পেশার কারণে বাবাকে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে হতো। অন্যদিকে এই গবেষণার প্রতি অধিক আগ্রহ বলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বেশীদূর এগুতে পারেনি। এক পর্যায়ে দুই ভাই প্রিন্টিং ব্যবসা শুরু করে এবং একই সাথে WEST SIDE NEWS নামক একটি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন। কিন্তু এ ব্যবসা ভালো চললেও এক্ষেত্রে তাঁদের মন বসে না। তাঁরা ১৮৯২ সালে এ ব্যবসা বাদ দিয়ে বাই-সাইকেল তৈরি কারখানা শুরু করেন। এই ব্যবসায় আর্থিক সফলতা আসলেও তাঁদের আকাশে উড়ার সুপ্ত বাসনা বাস্তবায়নে মাথা চারা দিয়ে উঠে। তারা প্রথমে জর্জ কেইলি চানিউট ও ল্যাংলি সহ লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির এরোনেটিক তথ্যাদি সংগ্রহ করেন এবং একই সাথে উড়োজাহাজ তৈরীর যে সকল সমসাময়িক কাগজপত্র প্রকাশিত হয়েছিল তার উপরও গুরুত্ব দেন। আর এই তথ্যাদির উপর ভিত্তি করে নিরলস গবেষণা চালিয়ে যান। ১৮৯৯ সালের জুলাই মাসে পাঁচ ফুট উচ্চতার একটি বাক্সের পাখা ঘুড়িতে বেঁধে উড়ার চেষ্টা করেন এতে আশানুরূপ ফল না পেলে পরের বছর গ্লাইডার তৈরি করে নর্থ ক্যাবেলিনার কিটিটক নামক খালি জায়গা নিয়ে সেখানে উড্ডয়নের সচেষ্ট হন। আর উড্ডয়ন মাত্র বার সেকেন্ড স্থায়ী হলে তাঁরা দমে যাননি। এরই সূত্র ধরে পর পর দু’বছর (১৯০১-০২ সাল) পরীক্ষা করেন। তৃতীয় বারে (১৯০৩ সাল) নিজেদের উদ্ভাসিত ব্যবহার করে সাফল্য অর্জন করেন। এ প্রেক্ষাপটে অনেক বার উড়েন এবং এর নাম দেন “ফ্লাইয়া-১”। এরপর তাদের সাধনা অব্যাহত থাকে। ১৯০৪ সালে তৈরি করেন ফ্লাইয়ার-৩ এবং এদিয়ে তারা ১০৫ বার উড্ডয়ন করেন। এটির সূত্র ধরে আমেরিকার বিখ্যাত পত্রিকা হেরুন্ড ট্রিবিউন সহ বিশ্বের নানা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে বিশ্বের আকাশে উড়োজাহাজের চলমান উড্ডয়ন অব্যাহত থাকে। এটি ইতিহাস ভিত্তিক প্রতিষ্ঠিত সত্য যে আবিষ্কারক রাইট ভ্রাতৃদ্বয় উড়োজাহাজ আবিষ্কারকের প্রাক্কালে ব্ল্যাক বক্সও সংযোজিত করেন। বর্তমানে তাদের উড়োজাহাজের অত্যাধুনিক পর্যায়ে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু আমরা কখনও ভুলতে পারবো না এই চির কুমার ভ্রাতৃত্বের কথা। বিয়ের কথা প্রসঙ্গে প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন আমাদের সাধের উড়োজাহাজ এবং আমাদের স্ত্রী উভয়ই এক সাথে রাখা সম্ভব নয়। এতে বোঝা যায়, শুধু উড়োজাহাজ আবিষ্কারের কারণে তাঁরা চিরকুমার। এ যে কত বড় ত্যাগ ১৯০৩ সাল থেকে ১১৬ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। এখন প্রত্যহ হাজার হাজার উড়োজাহাজ আকাশে উড়ে এবং এটা অবলম্বন করে প্রত্যেকদিন লক্ষ্যাধিক প্যাসেঞ্জার/যাত্রী বিভিন্ন দেশে যেয়ে কোনো না কোনো জরুরী কাজ সমাধা করে থাকেন। এর জন্য সবার পক্ষ থেকে রাইট ব্রাদারদ্বয়ের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। আর তাঁদের অবদান কভু ভুলবার নয়।
