শতবর্ষের ‘মুক্তি’

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৯, ১৯:২১

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর অনুবাদ কাব্য ‘রুবাইয়াত্-ই-হাফিজ’-এর মুখবন্ধ আরম্ভ করেছেন এভাবে— ‘আমি তখন স্কুল পালিয়ে যুদ্ধে গেছি। সে আজ ইংরেজি ১৯১৭ সালের কথা। সেইখানে আমার প্রথম হাফিজের সাথে পরিচয় হয়।

আমাদের বাঙালি পল্টনে একজন পাঞ্জাবি মৌলবী সাহেব থাকতেন। একদিন তিনি দীওয়ান-ই-হাফিজ থেকে কতকগুলি কবিতা আবৃত্তি ক’রে শোনান। শুনে আমি এমনি মুগ্ধ হয়ে যাই যে, সেই দিন থেকে তার কাছে ফার্সি ভাষা শিখতে আরম্ভ করি।

তাঁর কাছে ক্রমে ফার্সি কবিদের প্রায় সমস্ত বিখ্যাত কাব্যই পড়ে ফেলি।’

এই বর্ণনা পড়ে আমাদের মনে হতে পারে করাচি ক্যান্টনমেন্টে থাকাকালে নজরুল ইসলাম হয়তো ফার্সি কাব্য নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। ব্যাপারটি আসলে মোটেই তা নয়। সৈনিকজীবনের কঠোর নিয়ম-কানুন মেনে শত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি বাংলাভাষায় সাহিত্যচর্চা করেছেন। নিজেই লিখেছেন—‘সৈনিকের বড় কষ্টের জীবন। আর তার চেয়ে হাজারগুণ পরিশ্রম করে একটু একটু লিখি।... আমাদের এখানে সময়ের money-value, সুতরাং লেখা সর্বাঙ্গ সুন্দর হতেই পারে না। Undisturbed time মোটেই পাই না। আমি কোনো কিছুরই কপি duplicate রাখতে পারি না। সেটি, সম্পূর্ণ অসম্ভব।’

বলতে গেলে অসম্ভবকেও তিনি সম্ভব করেছিলেন। ‘আরব সাগরের বিজনবেলায় বসে’ নজরুল যে সমস্ত গল্প লিখেছিলেন তার সমষ্টি ‘রিক্তের বেদন’। এতে ‘সালেক’ নামে একটি গল্প আছে—গল্পটি হাফেজের সুবিখ্যাত একটি গজলের মূলভাবের রূপ। ‘ব্যথার দান’ গল্পগ্রন্থের ‘ব্যথার দান’ গল্পটি করাচি থাকতেই ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় প্রকাশিত হয়। তাতে ‘শিরাজ বুলবুলের দিওয়ান’ এবং সাধকশ্রেষ্ঠ প্রেমিক রুমীর গজলের কথা আছে। এ সময়ে তিনি ‘দীওয়ান-ই-হাফিজ’ থেকে মূলের ছন্দ অনুসরণ করে ছয়টি গজল বাংলায় অনুবাদ করেন। আরো লিখেছেন ‘বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী’, লিখেছেন কবিতা ‘মুক্তি’ এবং ‘কবিতা-সমাধি’। অবশ্য নজরুল ‘কবিতা-সমাধি’তে জানাচ্ছেন—

‘চাটুবাক্যে লুব্ধ হয়ে কবিতা রাশিকে

পাঠালাম ছোট বড় সকল মাসিকে।’

অর্থাত্ তিনি রাশি রাশি কবিতা লিখেছেন। কিন্তু পাঠকের কাছে এসেছে মাত্র দুটি কবিতা—‘মুক্তি’ এবং ‘কবিতা-সমাধি’।

বিভিন্ন কারণে কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘মুক্তি’ কবিতাটি বিখ্যাত হয়ে আছে। মুজফ্ফর আহমদ তার লেখা ‘নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে যা লিখেছেন তা থেকে জানা যায়, ‘বর্তমান শতাব্দীর দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ দশকে কলকাতার একটি সাহিত্য-সংগঠনের নাম ছিল ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’। ১৯১৮ সালে (এপ্রিল-মে মাস) সমিতির একখানা ত্রিমাসিক মুখপত্র বের করা হয়। নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’। এই পত্রিকায় ১৯১৯ সালের (জুলাই-আগস্ট) শ্রাবণ সংখ্যায় কাজী নজরুল ইসলামের ‘মুক্তি’ শীর্ষক কবিতাটি ছাপা হয়। যতদূর জানা যায় এটিই ছিল নজরুলের প্রথম পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতা। এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন মৌলভী মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এমএ, বিএল এবং কবি মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বিএ। নজরুল কবিতাটির নাম দিয়েছিলেন ‘ক্ষমা’—তাঁরা নাম বদলে রেখেছিলেন ‘মুক্তি’। সেজন্য নজরুল মনোক্ষুণ্ন হননি, বরং করাচি ক্যান্টনমেন্ট থেকে ব্যাটালিয়ন কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম ১৯ আগস্ট ১৯১৯ সালে সম্পাদককে উচ্ছ্বাস ভরা চিঠি লেখেন—‘মুক্তি’ নাম দিয়েছেন, তাতে আমি খুব সন্তুষ্ট হয়েছি। এরকম দোষগুলি সংশোধন করে নেবেন।’

মুজফ্ফর আহমদ আরো লিখেছেন—‘মুক্তি’ নামক কবিতা যখন সাহিত্য পত্রিকায় প্রথম ছাপা হয় তখনই আমরা স্থির করেছিলাম যে, নজরুল ইসলামের সব লেখা আমরা সাহিত্য পত্রিকায় ছাপাব, আর যতটা সম্ভব তাকে আমরা সকলের সামনে তুলে ধরব। কারণ...আমি কিন্তু নজরুল ইসলামের এই কবিতাটিতে তার ভবিষ্যত্ সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলাম। তার এই কবিতা এবং ‘হেনা’ ও ‘ব্যথার দান’ প্রভৃতি ছোটগল্প পড়ে আমার মনে হয়েছিল যে, বঙ্গ সাহিত্যে একজন শক্তিশালী কবি ও সাহিত্যিকের উদ্ভব হতে যাচ্ছে।’

এছাড়া ‘সাহিত্য’ ভাদ্র, ১৩২৬ মাসিক সাহিত্য সমালোচনাতে লেখা হয়—‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, শ্রাবণ-এ কথাটি এভাবে প্রকাশিত হয়—‘শ্রী কাজী নজরুল ইসলাম বঙ্গ বাহিনীর একজন হাবিলদার, ইনি করাচির সেনানিবাসের কর্ম কোলাহলের মধ্যেও মাতৃভাষাকে স্মরণ করিয়াছেন, মাতৃভাষার অনুশীলন করিতেছেন। রবীন্দ্রনাথের পদ্য-গল্পগুলি পড়িয়াছেন, এবং তাঁহার অনুসরণে ‘মুক্তি’ লিখিয়াছেন। বাঙালী সৈনিক শিবিরে যে ভাষার সাধনা করিতেছেন, সে ভাষার আশা করিব না? অনুকরণ সম্পূর্ণ সফল হইলেও অনুকরণ। এ অনুকরণ সর্বাংশে সফল হইয়াছে, এমন কথাও বলিতে পারি না। কিন্তু একজন নব-ব্রতী মুসলমান রবীন্দ্রনাথের ছন্দের ও ভাষার এতটা সন্নিহিত হইয়াছেন, ইহাও অল্প প্রশংসার বিষয় নহে।’

আমরা জানি আসানসোলে রুটির দোকানে কাজ করতেন যখন নজরুল তখন ‘মৌনী ফকির’ নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন এক ভিখারিকে নিয়ে। ‘মুক্তি’ কবিতাটিতেও আসানসোলের এক মৌনী ফকিরের কথা উল্লেখ আছে। কবিতাটির পাদটীকায় নজরুল লিখেছিলেন, ‘ইহা সত্য ঘটনা। ১৯১৬ সালের এপ্রিল মাসে এই দরবেশের কথিত রূপ শোচনীয় মৃত্যু ঘটে। তাঁহার পবিত্র সমাধি এখনও ‘হাত বাঁধা ফকিরের মাজার শরিফ’ বলিয়া কথিত হয়।’

‘মৌনী ফকির’ এবং ‘মুক্তি’ দুটি কবিতাই সন্ন্যাসী ফকিরদের মৃত্যু সম্পর্কিত; কিন্তু দুটি কবিতার মধ্যে ভাষা ও ছন্দে পার্থক্য লক্ষণীয়। নজরুল প্রথম জীবনেই অক্ষরবৃত্তে তার স্বকীয়তা দেখিয়েছেন মুক্তবদ্ধ কবিতার পঙিক্ত রচনায়। পরিণত বয়সে রবীন্দ্রনাথ তার ‘বলাকা’ কাব্যে লিখেছেন মুক্তক অক্ষরবৃত্ত ছন্দে। তরুণ কবি নজরুল অনেকটা সার্থকভাবেই তা ‘মুক্তি’ কবিতায় অনুশীলন করেছেন। ‘বলাকা’য় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—

‘সন্ধ্যারাগে-ঝিলিমিলি ঝিলমের স্রোতখানি বাঁকা

আঁধার মলিন হল, যেন খাপে ঢাকা।

        বাঁকা তলোয়ার;

দিনের ভাটার শেষে রাত্রির জোয়ার

এল তার ভেসে আসা তারাকুল নিয়ে কালো জলে;

        অন্ধকার গিরিতট তলে।’

নজরুল ইসলাম ‘মুক্তি’ লিখেছেন এভাবে—

      ‘রাণীগঞ্জের অর্জুন পটির বাঁকে

যেখান দিয়ে নিতুই সাঁঝে ঝাঁকে ঝাঁকে

রাজার বাঁধে জল নিতে যায় শহুরে বৌ কলস কাঁখে—

      সেই সে বাঁকের শেষে

      তিনদিক হতে তিনটি রাস্তা এসে

ত্রিবেণীর ত্রিধারার মত গেছে একেই মিশে।’...

এই দুটি উদাহরণ পড়লে অনুমান করা যায়—ভাবের স্বচ্ছতায় বর্ণনার সহজবোধতায়, ছন্দের ঝংকারে ‘মুক্তি’ কোনো অংশে কম নয় ‘বলাকা’ থেকে। জয়তু শতবর্ষের ‘মুক্তি’, জয়তু নজরুল!!