অখণ্ড ভারতের স্বপ্নভঙ্গ ও বাংলা ভাগ

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৯, ১৯:২২

ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের আগমন-ব্যবসা-বাণিজ্য আধিপত্য বিস্তার ও শাসনক্ষমতার আগে কখনোই ভারতকে খণ্ডিতকরণ, বাংলা ভাগ এবং সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ানো—প্রাথমিকভাবে এসব কিছু ছিল না। হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের ভেতর দিয়েই এদেশে বসবাস করে আসছিল। কিন্তু ব্রিটিশশক্তি তাদের কূটকৌশলে ও হীনস্বার্থে ভারতকে খণ্ডিত ও বাংলাকে ভাগ করতে গিয়ে এক ভয়ারহ বেদনার অধ্যায় রচনা করে। গান্ধী-নেহেরু-জিন্নাহ তাদের কূটকৌশলে রাজনীতির বলি হয়ে ভারতকে খণ্ডিত করেছেন, বাংলাকে ভাগ করে ফেলেছেন। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুসহ আরো অনেক বিপ্লবী ভারতকে ব্রিটিশমুক্ত করে ‘অখণ্ড ভারত’ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে যে দৃঢ় বিপ্লব সংঘটিত করেছিলেন, তা গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হলেও, শেষপর্যন্ত তাদের আদর্শ সফল হয়নি।

ইংরেজ সরকার প্রথম থেকেই হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সংঘাত-হানাহানি-বিরোধ সৃষ্টি করার নানা কূটকৌশল গ্রহণ করেছিল। তা অনেকখানি সফলতা পায় এদের ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে। আর এর ফলেই সংঘটিত হয়েছিল কলকাতায় ১৯৪৬-এর ভয়াবহ দাঙ্গা। ভারতভাগের কারণে বাংলা ভাগ হয়েছে—ঐতিহাসিকভাবে এটা চরম সত্য। কিন্তু এই ভাগের পেছনে ক্রীড়নক হিসেবে কারা ছিলেন এবং কাদের স্বার্থে তারা এটা করেছিলেন, সে কথাও আছে। দেশভাগের আগে প্রায় দেড়শত বছর অবিভক্ত বাংলার উন্নয়ন তা সম্পূর্ণভাবে পশ্চিম বাংলাকেন্দ্রিক। পূর্ববাংলা সবসময় অবহেলিত ছিল। দুই বাংলার আর্থ-সামাজিক ব্যবধান যে কত ভয়াবহ ছিল তা কল্পনা করাও কঠিন। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও বাংলা ভাগ ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছিল এবং এতে কংগ্রেস ও হিন্দুসভার ব্যাপক প্রভাব ও ভূমিকা ছিল। সুভাষচন্দ্র বসুর অখণ্ড ভারতের স্বপ্নপ্রয়াস গান্ধী-নেহেরুদের কূটচালের কাছে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পর্যবসিত হয়েছিল। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ব্রিটিশমুক্ত অসাম্প্রদায়িক যে ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছিলেন, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ স্বাধীনের মাধ্যমে সেই অসাম্প্রদায়িক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বের কাছে বিস্ময় সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। তিনি ভাষার শক্তিতে এদেশের হিন্দু-মুসলমানকে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাঁধতে পেরেছিলেন। সর্বদিক থেকে বঞ্চিত ও শোষিত এ দেশ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন হয়ে যেমন গোটা পৃথিবীকে অবাক করে দিয়েছিল, তেমনি তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ দেশের অসামান্য উন্নয়ন সাধন করে অসাম্প্রদায়িক একটি দেশ হিসেবে বিশ্বের কাছে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন।

গ্রন্থে তথ্যসমৃদ্ধ একটি পটভূমি আছে, যা পুরো গ্রন্থের বক্তব্যকে চমত্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পটভূমিতে ভারতে দ্রাবিড়, অস্ট্রিক, মঙ্গোলীয়দের অবস্থান এবং এদের পরে আর্যদের আগমন, বসবাস ও হিন্দু ধর্মচর্চা এবং ক্ষমতাপ্রয়োগ ইত্যাদি বিষয় উঠে এসেছে। আর্যদের পর আরব এবং পরবর্তীকালে তুর্কি ও মোগলরা ক্ষমতায় আসে। এরপর ইংরেজ শাসন ও আধিপত্য এবং সম্পদ লুণ্ঠনের ইতিহাস। ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার জন্য তখন নানামাত্রিক যেসব আন্দোলন ও বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল—এসব বিষয় ধারাবাহিকভাবে সাবলীল ভঙ্গিতে পটভূমিতে রূপ পেয়েছে।

এ গ্রন্থে দুর্লভ অনেক ছবি স্থান পেয়েছে। ছবিগুলোর প্রকৃত ইতিহাস আবিষ্কার ও প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। লেখকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য বিশেষভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। যা সাধারণত অধিকাংশ গ্রন্থে লক্ষ করা যায় না। কারণ নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও সুনির্দিষ্ট মন্তব্য বিশেষভাবে উপস্থাপন করতে হলে লেখকের সাহস ও শক্তি, সঠিক তথ্য-উপাত্তের ব্যবহার এবং অবশ্যই নির্মোহ নিরপেক্ষ বিচারিক ক্ষমতার অধিকারী হতে হয়, না হলে এটি সম্ভব নয়। গ্রন্থের শেষে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, গ্রন্থের সময়কাল ক্রমানুসারে সাল হিসেবে সাজানো, বিষয়ভিত্তিক পরিভাষা ও গ্রন্থপঞ্জির সংযোজন ও উপসংহার গ্রন্থকে পূর্ণতা দিতে সহায়ক হয়েছে। গবেষণার গতানুগতিক আঙ্গিক-ধারা থেকে বেরিয়ে নতুনভাবেও যে গবেষণাকর্ম করারও একটা প্রয়াস লক্ষ করা যায়। অখণ্ড ভারতের স্বপ্নভঙ্গ ও বাংলা ভাগ বাঙালির চিরকালের বেদনার মহাকাব্য।