ব্যাংকিং সেক্টরের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৯, ২১:০৮

দেশের ব্যাংকিং সেক্টরকে ঢেলে সাজানো দরকার। এ লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রী যথেষ্ট দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন। সম্প্রতি তিনি যথার্থ অর্থেই জানিয়েছেন যে, রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংক—সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংককে আর কোনো ঘাটতির জন্যে রিফাইন্যান্সিং করা হবে না। আসলে বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ বিশেষত রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংকের একমাত্র সোনালী ব্যাংক ছাড়া অন্যদের সেবার মান নিম্নমুখী। ব্যাংক যে অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে, তা সাধারণ জনমানুষের সঞ্চিত অর্থ। এ অর্থ সদ্ব্যবহার করা একান্ত প্রয়োজন। বিনিয়োগের পূর্বে অবশ্যই ভালোভাবে ঋণের আবেদনকারীর প্রস্তাব বিবেচনায় আনা উচিত ছিল। দুর্ভাগ্যজনক যে, বছরের পর বছর ক্ষতির সম্মুখীন হলেও ঋণ আদায়ে তেমন সাফল্য দেখাতে পারছে না। সোনালী ব্যাংক ৫১টির মতো বিভিন্ন সার্ভিস দিয়ে থাকে—এর জন্য অবশ্য কোনো ধরনের আয় পায় না। ব্যাংকিং সেক্টর একটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ধমনীস্বরূপ। দেশের অগ্রযাত্রায় যেমন ব্যাংক কাজ করতে পারে, তেমনি ব্যাংকিং ব্যবস্থা যদি সঠিক মাত্রায় ফান্ড ম্যানেজমেন্ট না করে, তাহলে কেবল পুঁজি ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাবে তা নয়, বরং দেশে বাইরেও চলে যেতে পারে। ব্যাংকের নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে সঠিক ব্যবসায়ী-শিল্পপতি ও উদ্যোক্তা শ্রেণিকে দেখেশুনে বিনিয়োগ করার। আসলে আমাদের দেশে আমানতকারীদের আমানতের ওপর কোনো বিমা করা থাকে না। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ব্যাংক ফেল করলে আমানতকারীর কোনো অসুবিধা হয় না। কেননা তাদের আমানতের ওপর বিমা করা থাকে। এটি আসলে দেশে বর্তমান উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

দীর্ঘদিনের সঞ্চিত ও পুঞ্জীভূত সমস্যা ঋণখেলাপি সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কিন্তু সমস্যা সমাধানের সহজাত কোনো পন্থা নেই। অন্তত একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করলে তা বাস্তবায়নে সময় লাগে। দেশের অগ্রযাত্রার বৃহত্তর স্বার্থে ঋণখেলাপি সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এমনিতেই বর্তমানে সরকার ব্যবসায়-বাণিজ্য পদ্ধতিকে সহজতর করতে চাইছেন। এটি ব্যবসায় করার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। যদি দেশে ব্যবসায় করার জন্য ‘ওয়ান স্টপ’ সার্ভিসের আওতায় আনা যায়, তাহলে দেশে যেমন ব্যবসায়-বাণিজ্যের উন্নয় সম্ভব হবে, তেমনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কেননা মোট জাতীয় উত্পাদন প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ ভালো করেছে, যা ৮.১৩ শতাংশ। এক্ষণে সমতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন, যা তখনই বাস্তবায়নে সাফল্য আসবে যখন কর্মসংস্থানের হার বৃদ্ধি পাবে। বেসরকারি খাতে শিল্পায়ন, কৃষি খাত ও সেবা খাতসহ নানামুখী পদক্ষেপ যদি কর্মসংস্থানের দিকে নজর দেয়, তাহলে তা দেশের জন্য উপকার বয়ে আনবে। কর্মসংস্থানের জন্য বিভিন্ন খাতকে শক্তিশালী করতে হবে।

বিজনেস প্রফেসর আউটসোর্সিংয়ের (BPO) মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে ১ বিলিয়ন ডলার আয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যা বর্তমানে বছরে ৩০০ মিলিয়ন ডলার। আসলে যুগোপযোগী তারুণ্য, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা-জ্ঞান-প্রজ্ঞা এবং বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ যেমন দরকার, তেমনি এজন্য চতুর্থ শিল্পবিপ্লবকে বাংলাদেশের মতো দেশে উপযোগী করে ব্যবহার করতে হবে। এ শ্রমশক্তিকে ইংরেজি ও ডিজিটালাইজেশনে সম্পৃক্ত করার কাজ চলছে। তবে ব্যাংকিং সেক্টর যদি অর্থায়নের কাজে জড়িত হয় এবং উদ্ভাবনী ও ধীশক্তিসম্পন্ন মানবসম্পদ তৈরি করে, তাহলে তা দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনতে পারে। ঢাকার বাইরেও ২০টি হাই-টেক পার্ক তৈরি করা হচ্ছে, যাতে বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিংয়ের কাজে লাগানো যায়। আমাদের তারুণ্য আমাদের সম্পদ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মান আধুনিকও যুগোপযোগী করতে সরকার বদ্ধপরিকর। এজন্য প্রয়োজনে বিদেশ থেকে শিক্ষক আনার কথাও বলা হয়েছে।

উদ্ভাবনীমূলক কর্মকাণ্ডকে উত্সাহ প্রদান করার লক্ষ্যে সরকার যে স্টার্ট আপ কর্মসূচি গ্রহণ করছে, তা দেশের জন্য একটি যুগান্তকারী ঘটনা। সরকার ১ হাজারটির মতো স্টার্ট আপ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে, যেসব পণ্য দেশে-বিদেশে বিক্রি করে আয় করা সম্ভব সেগুলো উদ্যোক্তা শ্রেণি সৃষ্টির মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি ও লাগসই কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের অগ্রযাত্রাকে রপ্তানি পণ্য বহুধাবিভক্তিকরণের মাধ্যমে উন্নয়নের গতিধারায় আনতে সচেষ্ট রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে আমাদের দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এগিয়ে আসা উচিত। অথচ মান্ধাতার আমলের ব্যাংকিং পদ্ধতি একই স্থানে ৫৯টি ব্যাংকের ছোটো বাজারে টানাটানি করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই খেই হারিয়ে ফেলছে। সরকারের যে উন্নয়ন কর্মসূচি তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যাংকগুলো সঠিক মাত্রায় উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে দেশের অর্থনৈতিক কর্মসূচি আরো বেগবান করা সম্ভব। আয় প্রবাহিত হলে, তা যেমন বাজার ব্যবস্থাপনায় উন্নয়নকে সম্ভব করে, তেমনি সরবরাহ ও চাহিদার ভিত্তিতে আচরণগত অর্থনীতির অংশ হিসেবে সিদ্ধান্ত-উপযোগী পরিবেশ ও পরিস্থিতি এবং সিদ্ধান্তের জন্য পুরস্কার ও তিরস্কার দুইয়ের ব্যবস্থা থাকা দরকার। তবে আধুনিক ব্যবস্থাপনায় কেবল অর্থায়নের মাধ্যমেই উদ্যোক্তা তৈরি করা যাবে না, এজন্য প্রয়োজন হচ্ছে শিক্ষাপ্রশিক্ষণ, আধুনিক ব্যবসায়-বাণিজ্য সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া এবং বিদেশের বাজারে অনুপ্রবেশের জন্য সেদেশ সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া। এ ব্যাপারে বিদেশস্থ বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোকে সহায়তার ক্ষেত্রে প্রসারিত হওয়া দরকার। স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরি করার জন্য নানাবিধ কার্যক্রম সরকার গ্রহণ করেছে।

স্বল্প মেয়াদের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। কেননা শিক্ষিত যুবক-যুবতী যারা উদ্যোক্তা হবেন তাদের মধ্যে উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে। আবার ব্যাংকগুলোকে কেবল ঋণ দিলেই চলবে না—নতুন উদ্যোক্তা ইচ্ছুকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, ব্যবস্থাপনাগত পরামর্শ, বিপণন ও বাজারজাতকরণগত পরামর্শ এবং সরবরাহজনিত পরামর্শের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

ব্যাংক ব্যবস্থায় যারা ঋণ গ্রহণ করছেন তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতাও থাকে। যখন ঋণ নেবেন, তখন ভালো করে কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস এবং বিজনেস প্ল্যানটিকে বাস্তবসম্মত করতে হবে—নচেত্ ব্যবসায়ের মূল উদ্দেশ্য যেমন নষ্ট হবে তেমনি খেলাপি ঋণের চক্করে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিদেশি ব্যাংকগুলো টার্ম লোন দেয় না—এ কারণে তাদের ঋণখেলাপির হার হচ্ছে ৫.৪৮ শতাংশ মাত্র। বুঝেশুনে ঋণ দেওয়া যেমন বাঞ্ছনীয়, পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবার থেকে এক জনের বেশি সদস্য এক মেয়াদের বেশি থাকা উচিত নয়। এজন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন করা দরকার। আবার ব্যাংকিং সেক্টরে অভিজ্ঞ লোকদের মধ্যে যারা সত্ তাদের ব্যাপারে পুনর্বিবেচনা করে মেয়াদ বৃদ্ধি করা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকে একজন দক্ষ বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ করা উচিত। কেননা বাণিজ্যিক ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পর্কে যদি সুস্পষ্টভাবে ধারণা থাকে, তাহলে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ত্রুটিবিচ্যুতি তদারকির সুবিধা হবে। এদিকে প্রতি মার্কিন ডলারের ক্রয়-বিক্রয়ে পার্থক্য ০.৫০ টাকার বেশি হওয়া উচিত নয়, যা বর্তমানে ১.৫০ টাকা থেকে ২.২৫ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে লোন প্রাইসিংয়ের রেট বেড়ে যাচ্ছে—এটি কমানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি বিলাসিতা বন্ধের সার্কুলার দিয়েছে। ঋণ ও আমানতের মধ্যে সুদের হারের ব্যবধান ২ শতাংশ হওয়া উচিত। এদিকে সিঙ্গেল ডিজিটে সুদের হার নির্ধারণে অধিকাংশ ব্যাংকই রাজি হচ্ছে না। অথচ এত উচ্চ সুদের হারে ব্যবসায় করা কঠিন। গ্রামীণ পর্যায়ে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে ক্ষুদ্র বিনিয়োগে আনতে সামাজিক ব্যাংক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, পল্লী ডাকঘরের সমন্বয়ে করা প্রয়োজন, যা পৃথক রেগুলেটরের আওতায় পরিচালিত হতে পারে। ভিয়েতনামের মতো দেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিকল্প ব্যবস্থা প্রয়োজন।

সরকার উদ্যোক্তা তৈরির নানামুখী প্রয়াস নিয়েছে। এটি যাতে সুন্দরভাবে বিরতণ করা হয় এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তরুণ-তরুণীরা সম্পৃক্ত হয়, সেজন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে কাজে লাগাতে হবে। আবার কোলাটেরাল ফ্রি ব্যাংকিংয়ের জন্য বেকার যুবক-যুবতিদের সার্টিফিকেট জমা রেখে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং কোথায় কোন ধরনের প্রকল্পের আওতায় ঋণ নিলে কে ভালো করবে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশে ক্রাউড ফান্ডিং (Crowd Funding), বুট স্ট্র্যাপিং স্টার্ট আপ অর্থায়ন ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে যে উদ্যোক্তা তৈরির আহ্বান এবং অর্থায়নের কথা বলেছেন, তা কোনো একটি-দুটি বিশেষায়িত ব্যাংকের মাধ্যমে তৃণমূল থেকে শুরু করে নগর পর্যন্ত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, বিনিয়োগ-ব্যবস্থাপনা, পণ্য বাজারজাতকরণ, বিপণনে সহায়তার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। একজন উদ্যোক্তার ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য সত্যিকারে যতটুকু অর্থ প্রয়োজন ততটুকু তাকে দেওয়া বাঞ্ছনীয়—কম বা বেশি নয়। আর সচেতনতা সৃষ্টির জন্য উদ্যোক্তা দিবস পালন করতে হবে। ব্যাংক অবশ্যই উদ্যোক্তাবান্ধব হতে হবে।

n লেখক :ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়াল ইকোনোমিস্ট

ইমেইল :[email protected]