ধুর! নীতি

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৯:৩২

 

g ইকবাল খন্দকার

 

আমার এক বড়ভাইয়ের সঙ্গে দেখা ম্যালাদিন পর। আমি খেয়াল করে দেখলাম তার চেহারায় এত বেশি পরিবর্তন এসেছে যে, চেনারই কথা ছিল না। নিতান্তই কপাল গুণে চিনে ফেলেছি। কপাল গুণে বলতে আমার কপাল গুণে না। বড়ভাইয়ের কপাল গুণে। প্রশ্ন আসতে পারে, বড়ভাইয়ের কপাল গুণে কীভাবে হয়? প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, টাক পড়ে বড়ভাইয়ের কপাল এতটাই বড় হয়ে গেছে যে, উনাকে অন্য একশজন থেকে তাকে আলাদা করা যায় সহজেই। তার কপালটাকে সেমি-স্টেডিয়াম বললে কেউ আপত্তি করতে পারবে না। বরং বলে উঠবে, ‘একদম পারফেক্ট উপমা।’ তো এই যে বললাম বড়ভাইয়ের চেহারার পরিবর্তনের কথা, কথাটা কিন্তু শতভাগ সঠিক। বছর দুয়েক আগে যখন তার সঙ্গে দেখা হয়, তখন তার করুণ দশা। জামা-কাপড়ে বিস্তর ময়লা। চুল এলোমেলো। মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি। অথচ এখন কী ছিমছাম! দেখেই মনে হচ্ছিল এইমাত্র এসি রুম থেকে বের হয়েছেন। এসি গাড়ি থেকেও বের হয়ে থাকতে পারেন। আমি সাগ্রহে জিজ্ঞেস করলাম, ‘চেহারা সুরতের এই চাকচিক্যের রহস্য কী?’ বড়ভাই বললেন, ‘হাতে টাকা থাকলে সবকিছুতেই চাকচিক্য থাকেরে পাগলা। তোদের দোয়ায় আয়-ইনকাম ভালোই হচ্ছে। একটা বাড়ি কিনেছি। আরেকটা কেনার পাঁয়তারা চলছে। গাড়ি তো কিনেছি আরও আগেই।’ আমি বললাম, ‘এত রাতারাতি এত টাকা পয়সার মালিক হওয়া কীভাবে সম্ভব?’ বড়ভাই বললেন, ‘কেন সম্ভব নয়। শুধু চা-পান খাওয়ার অভ্যাসটা বাড়াতে হবে।’ আমি বললাম, ‘চা-পান তো বলতে গেলে আমি ছোটবেলা থেকেই খাই। কই, আমার তো টাকা পয়সা হচ্ছে না!’ বড়ভাই বললেন, ‘আরে বোকা, নিজের টাকায় যে চা পান খায়, তার কোনোদিনও টাকা পয়সা হয় না। চা-পান খেতে হয় পরের টাকায়। তাহলে লালে লাল হয়ে যাওয়া সম্ভব।’ আমি বললাম, ‘ভাই, চাপাটা বোধহয় একটু বেশি মেরে ফেলা হচ্ছে। অন্যের টাকায় চা-পান খেলে বড়লোক হয়ে যাওয়া যাবে, টাকা-পয়সার মালিক হয়ে যাওয়া যাবে, এটা কেমন কথা? একটা চায়ের দাম কত? একটা পানের দামই বা কত?’ বড়ভাই এবার খিলখিলিয়ে হেসে দিলেন। বললেন, ‘এইখানেই তো কথা। যখন তোর কাছে মনে হবে চায়ের দাম দশ টাকা আর পানের দাম পাঁচ টাকা, তখন বুঝিবি তোর বড়লোক হওয়া দেরি আছে। আর যখন বুঝবি এক কাপ চায়ের দাম দশ লাখ টাকা আর এক খিলি পানের দাম পাঁচ লাখ টাকা, তখন বুঝবি বড়লোক হয়ে গেছিস।’ আমি বললাম, ‘এটা কী ধরনের কথা?’ বড়ভাই বললেন, ‘এটাই তো কথা। কেন, শুনিসনি অনেকেই টাকার বড় বড় ব্যাগ দিয়ে বলে—চা-পান খাওয়ার জন্য দিলাম। এবার বোঝ, এক কাপ চায়ের দাম কত পড়ে।’ আমি বুঝলাম বড়ভাই ঘুষের কথা বলছেন। যাকে বলা যায় দুর্নীতির বাবা-মা। তাই দ্রুত সরে গেলাম তার সামনে থেকে। কিছুদূর যেতেই আমার এক প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা। জিজ্ঞেস করলাম কোথায় যায়। তিনি বললেন, ‘চা খেতে।’ আমি ঠাস করে বলে বসলাম, ‘দশ টাকা দামের চা নাকি দশ লাখ টাকা দামের চা?’ আমার কথায় চোখ কপালে উঠে গেল প্রতিবেশীর। বললেন, ‘কী বলছেন আপনি? দশ লাখ টাকা দামের চা আছে নাকি?’ আমি বললাম, ‘আছে তো। কেন আপনি জানেন না?’ প্রতিবেশী বললেন, ‘না তো!’ আমি বললাম, ‘যেহেতু জানেন না, অতএব ধরে নেন, সারাজীবন আপনাকে ফুটপাতের চা-ই খেতে হবে। ফাইভ স্টার হোটেলের চা আর খাওয়া হবে না। আপনার জন্য মাত্রাতিরিক্ত আফসোস। নিন, গ্রহণ করুন আফসোসটুকু।’