তোদের একদিন কি আমার একদিন

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৯:৩৩

g মোহাম্মদ অয়েজুল হক

 

তিন বছর বিয়ে করেছে হাফিজুর। তিন বছর পর ইদানীং মনের ভিতর একটা আক্ষেপ কাজ করছে। ফেসবুক প্রেমের টানে ইউরোপ আমেরিকার সুন্দরী মেয়েরা সাগর-মহাসাগর পাড়ি দিয়ে দুলাল, আলাল টাইপের ছেলেদের কাছে ছুটে আসছে। কী স্মার্ট! ইশ! হাফিজুরের যে ফেসবুক ছিল না তা নয়। কষে টান মারতে পারেনি বলেই কপালে জুটেছে গ্রামের সহজ-সরল এক মেয়ে। আধুনিক যুগে সহজ-সরল বেমানান। এ যুগ টাকার যুগ। প্রযুক্তির যুগ। সপ্তাহ খানিক আগে মশা তাড়ানো ইলেকট্রিক ফুয়েল কিনেছিল। মশার যন্ত্রণায় অস্থির। মশারা সম্ভাবত দিনের বেলাতেও দেখা শুরু করেছে। নাকি আধুনিক কোনো লেন্সের ব্যবহার! দিন-রাত লেগেই আছে। যত মারছে তত বাড়ছে। গুড়ুম ধরনের শব্দে সাতদিন পর টানা সার্ভিস দিয়ে গরম হয়ে ফেটে গেল ফুয়েল ম্যাশিন। দুজনের ফ্লাটে একজন অলরেডি ফ্লাট! মড়ার মতো পড়ে আছে। অনেক সময় চোখে পানির ছিটা দেওয়ার পর ফাহিমা ক্যা ক্যা করে বলে, ‘কী হলো! চোখ মুখে ভয়ের ছাপ।’

—কী আর হবে! বিক্ষোভ, প্রতিবাদ।

—রাস্তার বিক্ষোভ ফ্লাটে উঠে এসেছে...

—ফ্লাটেই তো ছিল। সাতদিন। তোমার চোখ থাকলে কি আর এমন বিপদ ঘটতো।

—বিপদ... 

কথা শেষ করতে পারে না। মেয়েটা আবার জ্ঞান হারায়। হাফিজুরের মেজাজ গরম হয়। আজ মশার একদিন কি তার একদিন। রাত দুটোর সময় মশা মারা দুটো ব্যাট হাতে এ-ঘর ও-ঘর ছোটাছুটি। ফট ফট চট চট শব্দে আনন্দিত হলেও পরমুহূর্তে মশারা আবার কিলবিল করে ঘিরে ধরছে। চিত্কার দেয়, ‘কীরে তোদের কী হইছে! এত মিছিল কেন? সামনে নির্বাচন নাকি? তোরা তো মানুষ না।’ চটাশ, ফটাশ শব্দ। আবার চিত্কার, ‘তা আমাকে ঘিরে ধরছিস কেন! আমি তোদের ইসি সিসি ভিসি ফিসি কিছু না। আমি তো মানুষ। আমার বউ ভয়ে বেহুঁশ।’ শব্দে পাশের ফ্লাটের হামিদ সাহেব জেগে ওঠেন। শেষ রাতে ঘুম ভাঙা ঘোর—চিত্কার, গোলাগুলির শব্দ! লাফ দিয়ে বসে পড়েন। পাশের ফ্লাট থেকে শব্দ আসছে। উঁকি মারেন হামিদ সাহেব। দরজার ছোট ফাঁক দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ উঁকিঝুঁকি মেরে কিছু দেখতে না পেয়ে কান পাতেন। একটু পরেই চিত্কার শোনা যায়। ‘নির্বাচনের প্রার্থীও আমি না।’ ফটাশ, চটাশ। ‘আমি কোনো ঝগড়া-বিবাদের ভিতর নাই।’ আবার ফটাশ, চটাশ। কিছু বুঝে উঠতে না পেরে নিজের রুমে এসে মোবাইলটা হাতে নেন। হসপিটাল না পুলিশ! কাদের জানাবেন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাজ করে। ডিম লাইটের আবছা আলোয় খসখসে হাতের ছোয়ায় কেঁপে ওঠেন হামিদ সাহেব।

—কী হচ্ছে! হামিদ সাহেবের খিটখিটে বউ শরিফা বেগম। খপ করে মোবাইল কেড়ে নেয়। হামিদ সাহেব কাঁপা গলায় বলেন, ‘শব্দ শুনতে পাচ্ছ।’

—শব্দ দিয়ে বুড়ো বয়সে তোমার কাজ কী? এত রাতে মোবাইলে কী করো! কার সাথে...?

—শোনো...

—একদম চুপ। একটা কথাও বলবে না। সাগর এই সাগর।

সাগর তার বড় ছেলে।

হামিদ সাহেব বিমর্ষচিত্তে বলেন, ‘কী পাগলামো করছ?’

—আমি পাগল, কী ভাবো নিজেকে! আমি সব দেখেছি।

—কী দেখেছ!

—পাশের ফ্লাটে নবদম্পতি। উঁকি দাও! কী দেখ? আমি বিচার ডাকব। সারা মহল্লার মানুষ জানবে তোমার চরিত্র। তোমাকে ইলেকশনে দাঁড় করাব। মাইক নিয়ে আমিই ঘোষণা দেব—হামিদ সাহেবের চরিত্র, ফুলের মতো পবিত্র।

—কপাল!

—কীসের কপাল! প্রেমের টানে কেউ ছুটে আসছে না?

—দেখ আমার বুক ধড়ফড় করছে। বাজে কথা বলো না।

—কী আমি বাজে কথা বলি! আজ তোমার একদিন কি আমার একদিন।

ঠিক সে সময় একটা চিত্কার ভেসে আসে, ‘আজ তোদের একদিন কি আমার একদিন।’ হাফিজুর রুম ছেড়ে বাইরে এসেছে। চটাস ফটাস শব্দ। শরিফা বেগম বলে উঠেন, ‘আমরা কিছু জানি না বাপু। সব এই বুড়ো ধাড়ির দোষ!’

কার্টুন জ্যোতি