দীর্ঘদিনের পুরোনো নীতি থেকে সরছে ভারত!

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:১৬

এম এ আলআমিন

 

পরমাণু অস্ত্র আগে ব্যবহার না করার নীতি পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে ভারত। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সম্প্রতি এ কথা বলেছেন। দীর্ঘদিনের অনুসৃত নীতি দিল্লি এমন এক সময় পরিবর্তনের ঘোষণা দিল যখন কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বিলোপের পর এ নিয়ে পরমাণু শক্তিধর দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে চরম উত্তেজনা চলছে। বিষয়টির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উপমহাদেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর কী রকম প্রভাব ফেলতে পারে সেদিকে নজর দেয়া যাক। 

রাজনাথ সিং বলেছেন, ভারত এখনো পর্যন্ত যে কোনো সংঘাতে পরমাণু অস্ত্র আগে ব্যবহার না করার নীতিতে অবিচল আছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন তার দেশ কতদিন পর্যন্ত এর প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, ভবিষ্যত্ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে ভারত কতদিন এই নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। তিনি এটি পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে,পরমাণু অস্ত্র আগে ব্যবহার না করার নীতি থেকে ভারত যেকোনো সময় সরে যেতে পারে। ভারতকে কেউই এটা মেনে চলতে বাধ্য করতে পারবে না। তার এই বক্তব্য কোনো আকস্মিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয় বরং ভেবে-চিন্তেই তিনি সেটি বলেছেন। টুইটারেও তিনি একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তার এ কথার অনেকভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। একটি হলো এই নীতি বজায় রেখে প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করার জন্য এ কথা বলা হয়ে থাকতে পারে। অথবা স্পষ্ট কথা— ঐ নীতি থেকে সরে আসতে পারে দেশটি। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রথমে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের ঘোষণাও কোনোদিন দিয়ে বসতে পারে। বর্তমানে প্রতিটি পরমাণু শক্তিধর দেশই তাদের এই অস্ত্রকে নিরাপত্তার রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। তবে শীতল যুদ্ধ যুগে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য প্রয়োজন বোধে প্রথমে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণ করত। পরমাণু অস্ত্র প্রথমে ব্যবহারের দুটো অবস্থা বিবেচ্য ছিল। একটি হলো যখন  পরমাণু অস্ত্রধর দেশ প্রথাগত অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয়ের সম্মুখীন। তখন পরাজয় এড়ানোর জন্য এই অস্ত্র ব্যবহার করা। আরেকটি হলো পরমাণু অস্ত্রধর দেশটি শত্রু দেশের পরমাণু হামলার আশঙ্কার মুখোমুখি বলে আশঙ্কা হলে পরমাণু অস্ত্র আগে ব্যবহার শত্রুর পরমাণু সক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়া। ১৯৯৮ সালে ভারত যখন প্রথম পরমাণু পরীক্ষা করে দেশটি তখন এই অস্ত্র প্রথমে ব্যবহার করার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছিল। বলা হয়েছিল পরমাণু অস্ত্র কেবল আত্মরক্ষামূলক। ১৯৬৪ সালে চীন যখন প্রথম পরমাণু পরীক্ষা করেছিল তখন তারাও জানিয়েছিল কোনো অবস্থাতেই এই অস্ত্র প্রথমে ব্যবহার করা হবে না। সম্প্রতি উত্তর কোরিয়া পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হয়েছে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়। দক্ষিণ কোরিয়াও সম্ভাব্য মার্কিন আগ্রাসন টার্গেট করে এই অস্ত্র তৈরি করেছে। পিয়ংইয়ং যদিও দাবি করেনি এটি আত্মরক্ষামূলক। তবে দেশটি আগ বাড়িয়ে এটি ব্যবহার করবে, তা খুব কম সংখ্যক মানুষই বিশ্বাস করে।

সাধারণ বিবেচনায় বর্তমানে কোন্ দেশ পরমাণু অস্ত্র প্রথমে ব্যবহার করবে সেটি কেউ মনে করে না। এই কারণে নিউক্লিয়ার ডিটারেন্ট শব্দটির চল রয়েছে। যার অর্থ পরমাণু প্রতিরক্ষামূলক। ভারত যে এই প্রথম দুই দশকের নীতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিল তা নয় বরং ২০০৩ সালে একবার পরমাণু অস্ত্র প্রথমে ব্যবহার না করার নীতি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। দেশটিতে তখন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় ছিল। বলা হয়েছিল রাসায়নিক অথবা জৈব অস্ত্র আক্রমণের ঝুঁকি থাকলেই পরমাণু অস্ত্র প্রথমে ব্যবহার করা যেতে পারে। ২০১৬ সালে তত্কালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পরিক্কর প্রথমে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে তিনি পরবর্তীতে এটি পরিষ্কার করে দেন যে বিষয়টি তার ব্যক্তিগত মত, সরকারি সিদ্ধান্ত  নয়। কিন্তু বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী যেভাবে বলেছেন তাতে মনে হচ্ছে এটি সরকারের একটি নীতি সিদ্ধান্ত হতে পারে। ১৯৯৮ সালে ভারত যখন পরমাণু পরীক্ষা করে তখন দেশটির হাতে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র অত্যাধুনিক প্রথাগত সমরাস্ত্র ও উন্নত প্রযুক্তির পর্যবেক্ষণ সরঞ্জামাদি ছিল না। কিন্তু এখন দেশটির এ ধরনের সমরাস্ত্রের ভাণ্ডার বেশ সমৃদ্ধ। তাই এখন পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের পুরোনো নীতি থেকে আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে কাশ্মীরের জন্য সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা  আরো বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।