আমাজনে আগুনের নেপথ্যে

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:১৮

তৌহিদ আজিজ

 

আমাজনে আগুনের কারণ নিয়ে এখনো অনেক রহস্য ঘিরে রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, এটি মনুষ্যসৃষ্ট, আবার কারো মতে এটি প্রাকৃতিক। তবে কারণ যাই হোক না কেন পৃথিবীর ‘ফুসফুস’খ্যাত এই চিরহরিত্ বনাঞ্চল ধ্বংসে বৈশ্বিক পরিবেশ মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে। এ নিয়ে আশপাশের দেশগুলোর মধ্যে দোষারোপের সংস্কৃতিও কম নেই। তারা একে অপরকে বিষোদ্গার করতে পিছিয়ে নেই। এরই মধ্যে ক্ষতি মোকাবিলায় অর্থ সাহায্যের প্রস্তাব দেওয়া হলেও ব্রাজিল তা প্রত্যাখ্যান করেছে। এমনই বাস্তবতায় বিশ্ব পরিবেশবিদদের মধ্যে এ নিয়ে মারাত্মক দুশ্চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে।

দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদীবিধৌত অঞ্চলে এই বিশাল বনভূমি অবস্থিত। এর আয়তন ৭০ লাখ বর্গ কিলোমিটার। নয়টি দেশজুড়ে এই বনভূমি বিস্তৃত। এর মধ্যে শুধু ব্রাজিলের ৬০ শতাংশ, পেরুর ১৩ শতাংশ এবং বাকি অংশগুলো কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা, ইকুয়েডর, বলিভিয়া, গায়ানা, সুরিনাম ও ফরাসি গায়ানার। পৃথিবীজুড়ে যে রেইন ফরেস্ট তার অর্ধেকটাই এই আমাজন নিজেই। এখানে রয়েছে ৩৯০ বিলিয়ন বৃক্ষ যেগুলো প্রায়  ১৬ হাজার প্রজাতিতে বিভক্ত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যেভাবে এই আমাজনকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে তাতে আগামী দিনগুলোতে এর অস্তিত্ব কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা বলা মুশকিল। কেননা এখনো জ্বলছে আমাজন। স্যাটেলাইটের পাওয়া ছবিতে দেখা গেছে চারদিকে শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া। এতে করে ক্রমশ বের হচ্ছে কার্বন মনোক্সাইড। নাসা জানায়, ব্রাজিলের অংশে আমাজন যেভাবে পুড়ছে তা গত এক দশকের মধ্যে এত মারাত্মক আকার ধারণ করেনি। এতে আরো বলা হয় এর থেকে নির্গত ধোঁয়া প্রতিবেশী দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে, যা মনুষ্যকুলের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। এমন অবস্থায় ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টকে যখন জি-৭-এর পক্ষ থেকে অর্থ সাহায্যের প্রস্তাব দেওয়া হলো তখন তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অবশ্য এক্ষেত্রে তিনি বলেছিলেন, অর্থ সহায়তা তিনি গ্রহণ করতে পারেন যদি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাত্রেঁদ্ধা তাকে যে অপমান করেছিলেন তার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। যা হোক বিষয়গুলো হচ্ছে তাদের নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। মূল আলোচনায় ফিরে আসা যাক। কি কারণে আমাজনে এই আগুন? পরিবেশ সংস্থাগুলো এবং গবেষকরা বলছেন,  শুকনো মৌসুমে আমাজনের জঙ্গলে দাবানল একটা প্রচলিত ঘটনা। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এ ঘটনা ঘটতে পারে। আর মুনষ্যসৃষ্ট কারণের মধ্যে রয়েছে কৃষক এবং কাঠুরেদের ফসল উত্পাদন কিংবা পশু চরানোর জন্য জমি পরিষ্কার করতে জঙ্গলে আগুন দেওয়া। আমাজন ওয়াচের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ক্রিস্টোফার পোইরার বলেছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই আগুনের কারণ মনুষ্যসৃষ্ট। কাজেই আমরা আগুন লাগার কারণ হিসেবে দুটোকেই চিহ্নিত করতে পারি। তিনি বলেন, কৃষিকাজ এবং পশু চরানোর জন্য দীর্ঘকাল ধরে জঙ্গলে আগুন দেওয়া হচ্ছে। আর এভাবেই ভয়াবহ দাবানলের সৃষ্টি হচ্ছে। ব্রাজিলের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্চ বা আইএনপিই-এর ঊর্ধ্বতন বিজ্ঞানী আলবার্টো সেটজার বলেন, এই দাবানলের ৯৯ শতাংশ কারণই হচ্ছে মনুষ্যসৃষ্ট। হতে পারে এটা ইচ্ছাকৃতভাবে বা দুর্ঘটনাক্রমে। অবশ্য বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অনেকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বোলসোনারোর দিকেও দোষারোপের অঙুলি তুলছেন। তাদের মতে, দেশটির পরিবেশ সংস্থা আইবিএএমএ থেকে চলতি বছরে ২৪ শতাংশ বাজেট কর্তন করা হয়েছে। আর এর প্রভাব গিয়ে পড়েছে আমাজনের ওপর। তাদের বক্তব্য, এর আগেও তিনি বহুবার পরিবেশবিরোধী কথাবার্তা বলেছেন, যা মানুষকে জঙ্গল উজাড় করতে উত্সাহিত করেছে। এক্ষেত্রে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, বেসরকারি সংস্থাগুলো সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে নিজেরাই এই আগুন লাগিয়েছে। অন্যদিকে আমাজনের আগুনের  পেছনে আরো একটি কারণের কথা বিশ্ব মিডিয়ায় উঠে এসেছে। তাদের মতে, অবৈধ উপায়ে নজিরবিহীনভাবে সোনার খনি খোঁজ করার কারণে বনাঞ্চল ধ্বংস করা হচ্ছে। আমাজনের ২৪৫টি স্থানে এ রকম ২ হাজার ৩১২টি অবৈধ খনি রয়েছে। এ কারণে অর্থলিপ্সু মানুষগুলো সেখানে খনি বাণিজ্যের অভয়ারণ্য গড়ে তুলেছে।