আমাদের মনে প্রশ্ন জাগিয়াছে, রাজনৈতিক গুপ্তহত্যা ও গুম কে বা কাহারা শুরু করিয়াছিল? কেবল বাংলাদেশ নহে, বিশ্বব্যাপী বিশিষ্ট বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের গুম ও গুপ্তহত্যার জ্ঞাত ইতিহাস অনেক দীর্ঘ, অনেক বিস্তৃত। বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ, বিশেষত ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতার কাছাকাছি মানুষেরা গুম অথবা খুন হইয়াছেন প্রধানত তিনটি কারণে : ক্ষমতা, অর্থ ও ধর্মীয় মতভেদ। ইংরেজি অ্যাসাসিনেশন বা গুপ্তহত্যা শব্দটি আসিয়াছে আরবি ‘হাসহাসিন’ শব্দ হইতে। পারস্যে নিজারি শিয়া সম্প্রদায়ের নেতা হাসান-ই-সাব্বাহ একটি গোপন মিলিটারি সম্প্রদায় (ফেদাইন) গড়িয়া তুলিয়াছিলেন রাজনৈতিক ভিন্ন মতাবলম্বীদের গুপ্তহত্যা অথবা গুম করিতে। তিনি সারগোজাত্স ই সাইয়েদেনা নামে একটি আত্মজীবনীও লিখিয়া গিয়াছিলেন, যাহাতে অসংখ্য ভিন্নমতাবলম্বীদের গুম করিবার কথা স্বীকার করিয়াছিলেন। তবে রাজনৈতিক গুম ও গুপ্তহত্যার ইতিহাস এইখানেই শুরু নহে। প্রত্নতত্ত্ব গবেষকেরা গবেষণা করিয়া বাহির করিয়াছেন, এখন হইতে ৩ হাজার ৮৪৬ বত্সর আগে ইউনেটাইস কালচার যুগে আধুনিক জার্মানির একটি অঞ্চল হেমসডর্ফের যুবরাজকে রাষ্ট্রের অভিজ্ঞ কয়েকজন যোদ্ধা লোকচক্ষুর আড়ালে গুপ্তহত্যা করিয়াছিল। ইহাই জ্ঞাত ইতিহাসে সবচাইতে প্রাচীন গুপ্তহত্যা। বাইবেলে (ওল্ড টেস্টামেন্ট) উল্লেখ আছে, রাজা জোয়াসকে তার কৃতদাসরা হত্যা করিয়াছিল, রাজা ডেভিডের তৃতীয় সন্তান আবসালোমকে গুপ্তহত্যা করিয়াছিলেন ডেভিডেরই ভাগিনেয় এবং সেনাপতি জোয়াব। উপমহাদেশের প্রাচীন ইতিহাসেও গুপ্তহত্যার বহু নজির রহিয়াছে। মৌর্য রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য তাহার ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করিতে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটান। তাহার মধ্যে আলেকজান্ডারের দুই সেনাপতি নিকোবর ও ফিলিপ চন্দ্রগুপ্তের দ্বারা গুপ্তহত্যার শিকার হন। ইহা ছাড়াও সালতানাত যুগে, মোগল যুগে বহু প্রাসাদ-ষড়যন্ত্র, গুপ্তহত্যা ও গুমের কাহিনি বিদ্যমান, যাহা বলিয়া শেষ করিবার নহে।
আমরা জানি, হত্যাকাণ্ড আর গুপ্তহত্যা বা গুম করিয়া ফেলার মধ্যে খানিকটা উদ্দেশগত এবং পারিপার্শ্বিক পার্থক্য রহিয়াছে। আধুনিক যুগের ইতিহাসের আমরা আব্রাহাম লিংকন হইতে শুরু করিয়া ভূরি ভূরি ক্ষমতাশালীকে যেমন হত্যার সম্মুখীন হইতে দেখিয়াছি, তেমনি ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করিতে, কণ্ঠ রোধ করিতে রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারা বহু মানুষকে গুম, হত্যার শিকার হইতেও দেখিয়াছি। মাত্র কয়েক বছর আগে পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ, ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ, সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি, ইরানি গোয়েন্দা সংস্থা সাবাক, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই গুপ্ত হত্যার জন্য কুখ্যাত ছিল। শত শত মানুষকে তুলিয়া লইয়া ইহারা গুম করিয়াছে তাহাদের রাষ্ট্রের স্বার্থেই। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙিয়া যাইবার পর কেজিবি বিলুপ্ত হইয়াছে, সিআইএও ব্যক্তিমানুষকে গুপ্তহত্যা হইতে রেহাই দিয়াছে। এখন আদর্শের দ্বন্দ্ব নাই। অর্থনৈতিক আগ্রাসনের ক্ষেত্রে কাহারো কণ্ঠ রোধ করিতে হইলে তাহারা অর্থ ব্যবহার করিয়া থাকে। সুতরাং গুপ্তহত্যা কবে শুরু হইয়াছিল তাহা এক কথায় নির্দিষ্ট করা দুরূহ। কোনো গুপ্তহত্যাই কাম্য নহে। গুপ্তহত্যা বা কাহাকেও গুম করিয়া ফেলা জঘন্য অপরাধ বলিয়াই আমাদের বিশ্বাস। কিন্তু চলিয়া তো আসিতেছে জ্ঞাত ইতিহাস হইতেই!
