কুমিরাঘাটে বকশিশের নামে যাত্রী হয়রানি!

টাকা দিলে ডাঙায়, না দিলে নামানো হয় কোমরপানিতে

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:০১

 শামীম হামিদ, চট্টগ্রাম অফিস

চট্টগ্রামের কুমিরা ও সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাটে চলাচলকারী নৌযানের যাত্রীদের কাছ থেকে বকশিশের নামে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ ১৪ কিলোমিটার সমুদ্রপথের জন্য নির্ধারিত ভাড়া স্পিডবোটে ২৫০ টাকা এবং সাধারণ পণ্যবাহী বোটে ১০০ থেকে ১৩০ টাকা। তবে বোট কর্মচারীরা বকশিশের নামে যাত্রীপিছু অতিরিক্ত ৩০ টাকা করে আদায় করে। সাধারণত জেটি থেকে নৌকায় করে স্পিডবোটে ওঠার সময় ১০ টাকা বকশিশ আদায় করা হয়। এরপর বোটে আরেকবার ১০ টাকা এবং অপর ঘাটে গিয়ে নৌকায় ওঠার পর আবার ১০ টাকা নেওয়া হয়। কোনো যাত্রী স্পিডবোটের চালকের পাশের আসনে বসলে তাকে দিতে হয় আরো ৫০ থেকে ১০০ টাকা। বকশিশ আদায়কে কেন্দ্র করে প্রায়ই যাত্রী ও বোট কর্মচারীদের মধ্যে বচসা, হাতাহাতি বা মারামারির ঘটনা ঘটে। যারা বকশিশ দিতে চায় না তাদের নানাভাবে নাজেহাল করে থাকে বোটের কর্মচারীরা। বোট ঘাটে না ভিড়িয়ে যাত্রীদের পানিতে নামতে বাধ্য করা হয়। বকশিশ না দেওয়ায় যাত্রীবোঝাই নৌকাকে পানিতে ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল। ঐ ঘটনায় বোটের কয়েক যাত্রী হতাহত হয়েছিল। ঘাটের অরাজকতা নিয়ে সন্দ্বীপবাসীর মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে বছরের পর বছর ধরে।

জানা গেছে, চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের মোট জনসংখ্যা সাড়ে চার লাখ। দৈনিক ৫ থেকে ৮ হাজার যাত্রী কুমিরা-গুপ্তছড়া রুট ব্যবহার করে উপজেলা থেকে মূল ভূখণ্ডে আসা-যাওয়া করেন। তাদের একেকজনের কাছ থেকে যদি কমপক্ষে ১০ টাকা করেও বেশি নেওয়া হয় তাহলে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা শুধু বকশিশের নামেই তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে জেলা পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি নেই বলে অভিযোগ করেছেন সাধারণ যাত্রীরা। জেলা পরিষদ শুধু ইজারার টাকা নিয়েই দায়িত্ব সারে। ঘাটের ইজারা প্রতি বছর নবায়ন হওয়ার কথা থাকলেও গত কয়েক বছর ধরে তা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।  

ভুক্তভোগী যাত্রীরা অভিযোগ করেন, নিয়ম অনুযায়ী এক জন যাত্রী ১৫ কেজি মাল পরিবহন করতে পারেন। অতিরিক্ত প্রতি কেজির জন্য তিন টাকা হারে ভাড়া হওয়ার কথা। কিন্তু কোনো যাত্রীর হাতে দুটি ব্যাগ দেখলে বোট কর্মচারীরা পণ্য ওজন না করেই আরেকটি টিকিট কিনতে বাধ্য করেন। কেফায়েত উল্লাহ কায়সার নামে এক যাত্রী ইত্তেফাককে বলেন, টিকিট কাউন্টারে সব টাকা পরিশোধ করার পরও আবার সার্ভিস ও মালের কথা বলে মাঝ সাগরে প্রত্যেক যাত্রীর কাছ থেকে বকশিশের নামে জোর করে টাকা আদায় করা হয়। বকশিশ না দিলে পানিতে নামানো হয়। আর বকশিশ দিলে নামানো হয় ওপরে, শুকনায়। প্রতিবাদ করলেই তারা দুর্ব্যবহার করে। এ নিয়ে ঘাটের ইজারাদারের কাছে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। মোহাম্মদ বেলাল নামে এক যাত্রী এ প্রতিবেদককে বলেন, পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকি। সব আত্মীয়স্বজন সন্দ্বীপে থাকে। তাই বছরে একবার সবাইকে দেখতে না এলে নিজের কাছে খুব খারাপ লাগে। কিন্তু এভাবে কষ্ট করে পরিবার নিয়ে যাতায়াতে মারাত্মক বিড়ম্বনা।

বকশিশ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে ঘাটের ইজারাদার সন্দ্বীপের মগধরা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এস এম আনোয়ার হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমি পাইনি। অভিযোগ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঘাটের ইজারা নবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মামলার কারণে ইজারা নবায়ন বন্ধ রয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এম এ সালাম এ প্রসঙ্গে ইত্তেফাককে বলেন, বাড়তি নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ঘাটের সার্বিক তত্ত্বাবধানের জন্য ইজারাদার আছে। তার কাছে এ ধরনের ঘটনার বিষয়ে অভিযোগ করা যেতে পারে। কেউ যদি চান তাহলে এ বিষয়ে আমার কাছেও গোপনে অভিযোগ করতে পারেন। আমি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।