শায়লা ইসলাম নীপা
প্রতিটি সমাজের, যুগের আলাদা দর্শন বা চিন্তাগত কাঠামো রয়েছে। দর্শন যেমন সমাজের মানুষের জীবনযাত্রা, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মূল্যবোধসংক্রান্ত বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করে, তেমনি এগুলোও দর্শনকে প্রভাবিত করে। প্রতিটি সমাজ, যুগ বা সময়কে মূল্যায়ন করা যায় তার দর্শন বা চিন্তার পরিধি কতটা বিস্তৃত তা দিয়ে।
দর্শন ভাবাবেগের নয় বরং বিচার-বিবেচনাপ্রসূত দৃষ্টিভঙ্গি বা জ্ঞান। একজন ব্যক্তির দর্শন হলো তার মৌলিকত্ব এবং তার সামগ্রিক চিন্তা। আর এ চিন্তাকে কখনো দেশ, কাল, ধর্ম, বর্ণ— এগুলোর সীমানায় আবদ্ধ করা যায় না। এ চিন্তা মুক্ত, অবারিত বিহঙ্গের ন্যায়। জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম কাজ হচ্ছে নিজেকে জানা। এজন্যই গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘Know Thyself’. যে নিজেকে জানতে ব্যর্থ হয় সে তার নিজের এবং তার পারিপার্শ্বিক নিগূঢ় তত্ত্ব উন্মোচনেও ব্যর্থ হয়।
দর্শনের প্রশ্নাবলির নিশ্চিত কোনো সমাধান পাওয়া যায় না—এরূপ দাবি অনেকেই করে থাকেন। আর এজন্য একে বিজ্ঞান থেকে পুরোপুরি স্বতন্ত্র হিসেবে দেখানোরও প্রয়াস চালান অনেকে। এ কথা ঠিক যে, দর্শনের প্রশ্নাবলির সমাধান বিজ্ঞানের মতো সুনিশ্চিত হয় না। কারণ, এটি কোনো গবেষণাগারে প্রমাণযোগ্য নয়। বলা হয়, যেখানে একজনের দর্শনের শেষ, সেখানেই আরেকজনের দর্শনের সূত্রপাত ঘটে। এর অবিচ্ছিন্ন ধারা চলতেই থাকে। কোথায় এর শেষ তা কোনো বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরিতেও প্রমাণসাপেক্ষ নয়। তাই বলে দর্শনকে বিজ্ঞান থেকে আলাদা করা যায় না। তারা একে অপরের পরিপূরক।
বর্তমানের পুঁজিবাদী সমাজ ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক মানসিকতার প্রভাবে মানুষ দর্শন চর্চায় অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে। মানুষ চিন্তার মাহাত্ম্যকে উপলব্ধি না করে ক্ষমতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। এ কারণে সমাজে সুষ্ঠু মানসিকতার বিকাশ ঘটছে না। অন্যায়, অত্যাচার ও বিকৃত মানসিকতা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। বিবেক, মানবতা এগুলো বুদ্ধিবৃত্তির দ্বারা পরিচালিত না হয়ে যান্ত্রিক হয়ে পড়েছে। যেখানে বিশ্বের বড়ো বড়ো দেশগুলো জ্ঞান-বিজ্ঞানের শীর্ষে পৌঁছানোর পরও দর্শন চর্চা সেখানে সমাদৃত। সেখানে অতি দুঃখজনক যে, বাংলাদেশে সব জ্ঞান-বিজ্ঞানের জননীরূপে খ্যাত এ দর্শন আজ অবহেলিত।
দর্শনকে জীবন থেকে আলাদা করা যায় না। প্রতিটি মানুষের নিজস্ব জীবনদর্শন রয়েছে। দর্শনকে আলাদা করলে মানুষের জীবনের আদর্শকেই অমর্যাদা করা হয়। প্রকৃতপক্ষে, যে মানুষ যত বেশি চিন্তার প্রসার ঘটাতে পারে, সেই দিনশেষে যেকোনো কাজে তার সৃজনশীলতার পরিচয় দিতে পারে। মূলত দর্শন চর্চার জন্য জ্ঞানের গভীরে প্রবেশ করার মতো উর্বর মানসিকতার প্রয়োজন। জোর করে আর যা-ই হোক দর্শনচর্চা সম্ভব নয়। এর স্থান গভীরে, অন্তঃস্থলে, যেখানে জোরজবরদস্তির কোনো স্থান নেই। বরং যারা জোর করে দর্শনকে জানতে ও বুঝতে চেয়েছে, তারা একপর্যায়ে ব্যর্থ হয়েছে এবং পরিশেষে তারাই দর্শনকে বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত করে।
যারা দর্শনকে লালন করেছেন হূদয়ে, তারা দেশকালের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ করে রাখেননি। কোনো ক্ষমতার দাপট তাদের অবনত করতে পারেনি। আর এজন্যই গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস, ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিলেন এবং আজও দর্শনের ইতিহাসে বরেণ্য ও অনুসরণীয় হয়ে আছেন। বাঙালি দার্শনিকদের মধ্যে যাদের অবদান কখনো ভুলবার নয়, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অমর্ত্য সেন, লালন শাহ, ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব, অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, আরজ আলী মাতুব্বর প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। তাদের অনেকের হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও ছিল না, তত্থাপি তারা কখনো ছোটো বৃত্তে অবস্থান করেননি। দেশ, কাল, সীমানা ছাড়িয়ে পৃথিবী ছাপিয়ে বেড়িয়েছে তাদের চিন্তা।
বর্তমানের এই অস্থিতিশীল সমাজে বস্তুবাদী মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রেই দর্শনচর্চা আবশ্যিক হয়ে পড়েছে। এই ঘুণে ধরা সমাজকে একটি সুষ্ঠু কাঠামোতে নিয়ে আসতে, সুন্দর মননকে জাগ্রত করতে দর্শন চর্চার একটি নিরবচ্ছিন্ন ধারা সৃষ্টি করতে হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
